ইয়েমেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় তেলসমৃদ্ধ হাদরামাউত প্রদেশে সৌদি আরবের বিমান হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া হামলায় আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ, যাদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকও রয়েছেন। স্থানীয় একটি চিকিৎসা সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (০২ জানুয়ারি) সাইয়ুন পাবলিক হাসপাতালের একটি সূত্র সিনহুয়াকে জানায়, গত কয়েক ঘণ্টায় হাসপাতালে ২০টির বেশি মরদেহ আনা হয়েছে। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তারা চিকিৎসাধীন।
এর আগে দক্ষিণ ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি)-সমর্থিত স্যাটেলাইট চ্যানেল এআইসি জানায়, সৌদি যুদ্ধবিমানগুলো সাইয়ুন বিমানবন্দর ও আশপাশের আবাসিক এলাকায় ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এতে একই পরিবারের অন্তত সাত সদস্য নিহত হন।
স্থানীয় বাসিন্দারা সিনহুয়াকে জানান, আকস্মিক ও তীব্র বিমান হামলার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণভয়ে বহু পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
এদিকে সৌদি সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আদেনভিত্তিক ইয়েমেন সরকারের এক কর্মকর্তা বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সাইয়ুন বিমানবন্দরসহ বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার বিষয়টিকে গুরুতর বলে উল্লেখ করেন।
সৌদি বিমান হামলার পাশাপাশি হাদরামাউতে স্থলভাগে তীব্র সংঘর্ষ চলছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রদেশটির সামরিক ঘাঁটি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে এসটিসি-সমর্থিত বাহিনী এবং ইয়েমেনি সরকারি সেনাদের মধ্যে ব্যাপক লড়াই চলছে। উভয় পক্ষই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই শুক্রবার এসটিসি দুই বছরের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের ঘোষণা দিয়েছে। এ সময় তারা দেশের দক্ষিণাঞ্চল শাসন করবে এবং পরবর্তীতে দক্ষিণ ইয়েমেনের স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোট আয়োজন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
গত মাসে এসটিসি হাদরামাউত ও পূর্বাঞ্চলীয় আল-মাহরাহ প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নেওয়ার পর ইয়েমেন সরকার ও এসটিসির মধ্যে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে। সৌদি আরব এসব অঞ্চলকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচনা করে, কারণ এগুলো দেশটির সীমান্তের কাছাকাছি এবং ইয়েমেনের অবশিষ্ট জ্বালানি সম্পদের বড় অংশ এখানেই রয়েছে।
২০১৪ সাল থেকে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত ইয়েমেন। সে বছর হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানাসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নিলে ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে।
২০১৭ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত দক্ষিণ ট্রানজিশনাল কাউন্সিল দক্ষিণ ইয়েমেনের স্বায়ত্তশাসন ও শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। ২০২২ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হয়ে এবং ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলে অন্তর্ভুক্ত হলেও সংগঠনটি দক্ষিণের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে অবস্থান পরিবর্তন করেনি।
সর্বশেষ উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরব গত মঙ্গলবার ইউএইকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইয়েমেন থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহার এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সব ধরনের সহায়তা বন্ধের আহ্বান জানায়।
এর পর শুক্রবার ইউএইর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, তারা ইয়েমেন থেকে তাদের সব সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহার সম্পন্ন করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এবং সেনাসদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
পিএ/টিএ