ফরিদপুর-২ (সালথা ও নগরকান্দা) আসনের বিএনপি প্রার্থী এবং দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তার মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। গত ২৮ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
শামা ওবায়েদ একসময় একই সঙ্গে বাংলাদেশের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে, গত বছরের ২০ নভেম্বর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। হলফনামায় তিনি নিজেকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করে অ্যালিউর বিল্ডার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অ্যাভোসিল্ক সলিউশনের চেয়ারম্যান এবং ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কো-অপারেশন ফাউন্ডেশনের (আইজিসিএফ) জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা জানিয়েছেন। তার বয়স দেখানো হয়েছে ৫২ বছর ৭ মাস ১৫ দিন এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা বিজ্ঞানে স্নাতক (কম্পিউটার সায়েন্স)।
হলফনামা অনুযায়ী শামা ওবায়েদের নামে মোট ১৮টি মামলা ছিল। এর মধ্যে একটি মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন। ২০২৫ সালে ৮টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং আরও ৮টি মামলা থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। তবে একটি হত্যা মামলা এখনও তদন্তাধীন রয়েছে।
আয়ের হিসাবে দেখা যায়, ২০২৫ সালের হলফনামায় শামা ওবায়েদ তার বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ২১ লাখ ৮৯ হাজার ৭১ টাকা। এর মধ্যে অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া থেকে ১২ লাখ ৬০ হাজার টাকা, শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানতের মুনাফা ৪৬ হাজার ৪০৪ টাকা, চাকরির সম্মানী বাবদ ৭ লাখ ৮৬ হাজার ৬৬৭ টাকা এবং সম্মানী ভাতা বাবদ ৯৬ হাজার টাকা। অথচ ২০১৮ সালের হলফনামায় তার মোট আয় ছিল ৩০ লাখ ৬ হাজার ৮২৫ টাকা। অর্থাৎ সাত বছরের ব্যবধানে তার আয় কমেছে ৮ লাখ ১৭ হাজার ৭৫৪ টাকা।
তবে আয় কমলেও সম্পদের ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। ২০১৮ সালে শামা ওবায়েদের অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৫৩ লাখ ৮২ হাজার ২৮৭ টাকা। তখন তিনি বিয়ের সময় পাওয়া ৬০ তোলা সোনার কথা উল্লেখ করলেও এর কোনো মূল্য দেখাননি। ২০২৫ সালের হলফনামায় তার অস্থাবর সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৬২ লাখ ৮৫ হাজার ৮০৬ টাকা, যার বর্তমান আনুমানিক মূল্য ৪ কোটি ৩৭ লাখ ৮৫ হাজার ৮০৬ টাকা। অর্থাৎ সাত বছরে তার অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে ২ কোটি ৯ লাখ ৩ হাজার ৫১৯ টাকা। এই সম্পদের মধ্যে রয়েছে নগদ টাকা ২ কোটি ৫২ লাখ ৫১ হাজার ৮৯৪ টাকা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ৩০ লাখ ৩৩ হাজার ৯১২ টাকা, শেয়ার, বন্ড ও ঋণপত্রে বিনিয়োগ ৫০ লাখ টাকা, একটি জিপ গাড়ি ৩০ লাখ টাকা এবং ৫০ তোলা সোনা, যার কোনো মূল্য উল্লেখ করা হয়নি।
স্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ২০২৫ সালের হলফনামায় শামা ওবায়েদ তার স্থাবর সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য দেখিয়েছেন ৬ কোটি ৯৩ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং যার বর্তমান আনুমানিক মূল্য দেখানো হয়েছে ৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে রয়েছে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ৪৫০ শতাংশ অকৃষি জমি, যার কোনো মূল্য উল্লেখ করা হয়নি, এবং ঢাকার বনানীতে ৩ হাজার ২৪৫ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট। অন্যদিকে, ২০১৮ সালের হলফনামায় তার মোট স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ছিল ৭ কোটি ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। সে সময় তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ১.৫ একর কৃষি জমির কথা উল্লেখ করেছিলেন, যার মূল্য তার জানা ছিল না, এবং পৈতৃক সূত্রে পাওয়া তিনটি ফ্ল্যাটের আয়তন ছিল মোট ৬ হাজার ৬১০ বর্গফুট।হিসাব অনুযায়ী সাত বছরে তার স্থাবর সম্পদ কমেছে ১০ লাখ টাকা।
ঋণের তথ্যেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০১৮ সালে শামা ওবায়েদ এ্যলিউর বিল্ডার্স লিমিটেডের পরিচালক হিসেবে সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে দুই ধাপে মোট ৩ কোটি ৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। চলতি বছরের হলফনামায় তার নামে কোনো ঋণ দেখানো হয়নি, যা থেকে বোঝা যায়, এই সাড়ে তিন কোটির বেশি টাকার ঋণ তিনি পরিশোধ করেছেন।
হলফনামায় নির্ভরশীল হিসেবেও রয়েছে বড় অঙ্কের সম্পদের তথ্য। শামা ওবায়েদ তার স্বামী মুস্তাজিরুল শোভন ইসলাম এবং পুত্র আরভীন ওবায়েদ ইসলামকে নির্ভরশীল হিসেবে দেখিয়েছেন। স্বামীর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৮৮ লাখ ৮৬ হাজার ৪১৮ টাকা। তার অস্থাবর সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য ১৭ কোটি ২০ লাখ ৭৬ হাজার ৮০ টাকা এবং বর্তমান মূল্য ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ৭৬ হাজার ৮০ টাকা। এর মধ্যে নগদ টাকা, ব্যাংক আমানত, বন্ড ও ঋণপত্র, সঞ্চয়পত্র, স্থায়ী আমানত, ডাক সঞ্চয়পত্র ও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ, তিনটি মাইক্রোবাস এবং ৫০ তোলা সোনা রয়েছে, যদিও সোনার কোনো মূল্য উল্লেখ করা হয়নি। কৃষি জমি বাদে স্বামীর স্থাবর সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য দেখানো হয়েছে ১০ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং বর্তমান আনুমানিক মূল্য দেখানো হয়েছে ৫১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। তবে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ২১৬ শতাংশ অকৃষি জমির কোনো মূল্য দেখানো হয়নি। স্বামীর নামে ফ্ল্যাট কেনা বাবদ ১ কোটি ৬৭ লাখ ৪৭ হাজার ৯৬৪ টাকার ব্যাংক ঋণ রয়েছে।
ছেলের ক্ষেত্রে বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ১৮ লাখ ১ হাজার ৯৬২ টাকা। এর মধ্যে চাকরি থেকে আয় ১৮ লাখ টাকা এবং শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানতের মুনাফা ১ হাজার ৯৬২ টাকা। তার অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে নগদ টাকা ৪১ লাখ ৪৯ হাজার ২৩ টাকা, ব্যাংক আমানত ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৪০ টাকা, বন্ড ও ঋণপত্রে বিনিয়োগ ৫ লাখ টাকা এবং ৫০ তোলা সোনা। তবে তার কোনো স্থাবর সম্পত্তি দেখানো হয়নি।
সব মিলিয়ে দুটি হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাত বছরে শামা ওবায়েদের ঘোষিত আয় কমলেও অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে, পরিশোধ হয়েছে সাড়ে তিন কোটির বেশি টাকার ব্যাংক ঋণ, পরিবর্তন এসেছে নাগরিকত্বের অবস্থানেও।
এমআর/টিএ