দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শ্রোতাদের গান উপহার দিয়ে আসছে দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড মাইলস। দীর্ঘদিনের এই পথচলায় নানা স্মৃতি রয়েছে ব্যান্ডটির। এবার তেমনই এক স্মৃতির কথা জানালেন ব্যান্ড সদস্য হামিন আহমেদ। যে স্মৃতি সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) ফেসবুক ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে দেয়া এক দীর্ঘ পোস্টে খালেদা জিয়ার সঙ্গে জড়িত সেই স্মৃতিচারণ করেছেন হামিন আহমেদ। সেখানে শুরুতে ব্যান্ড সদস্য লিখেছেন, ‘এর আগে কখনো বলা হয়নি, এখন শেয়ার করছি।’
হামিন আহমেদ তার পোস্টের শুরুতে জানান, ১৯৯৩-৯৪ সালের কথা, ব্যান্ড মাইলসকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তার সেনানিবাসের শহিদ মঈনুল রোডের বাসভবনে সংগীত পরিবেশনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই সময়ের ঘটনা জানিয়ে তিনি লিখেছেন, তখন মাইলসের সদস্য ছিলাম আমি, শাফিন আহমেদ, মানাম ও সম্ভবত মাহবুব। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থাকবেন, এ কারণে ভীষণ রোমাঞ্চিত, কৌতূহলী ও কিছুটা নার্ভাস ছিলাম আমরা।
এ অনুষ্ঠানে তারেক রহমান এবং তার বন্ধুরাও উপস্থিত ছিলেন। আমরা শফিক ভাইকে সঙ্গে নিয়ে বাসভবনে যাই। ওই দিনই খালেদা জিয়াকে প্রথমবার সামনাসামনি দেখার সুযোগ হয় তিনি ছিলেন অভিজাত, ব্যক্তিত্ববান ও মার্জিত। এরপরও আমাদের সঙ্গে এমন আন্তরিকতা ও সৌজন্যতার সঙ্গে কথা বললেন, যাতে আমরা সবাই বেশ অভিভূত হয়েছিলাম। আর তারেক রহমান ও তার বন্ধুরাও আমাদের স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেন।
হামিন আহমেদ জানিয়েছেন, মূল অনুষ্ঠান শুরু করার আগে সাউন্ডচেক করেন তারা। এতে দুপুরের খাবারের সময় হয়ে যায়। তখনই ঘটে অভূতপূর্ব ঘটনা, এমনটা উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, আমরা বেলা ২টা থেকে ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত সাউন্ড চেক করি, যা মাইলসের জন্য স্বাভাবিক ঘটনা। তখন দুপুরের খাবার খাওয়ার সময়। স্বাভাবিকভাবেই জিয়া পরিবারের বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনরা আমাদের কাছাকাছি কোথাও দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এমন সময় সবাইকে অবাক করে দিয়ে খালেদা জিয়া বললেন, ‘না, ওরা এই বাড়িতেই খাবে। আমরা যা খাই, ওরাও তাই খাবে।’
সেদিন খাবারের টেবিলে মাইলস সদস্যদের অবাক করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর আতিথেয়তা। হামিন আহমেদ লিখেছেন, আমরা ডাইনিং টেবিলে বসলাম। আমরা বিস্মিত হই যখন তিনি নিজেই আমাদের প্লেটে খাবার তুলে দেয়া শুরু করেন। আমি আমার প্লেটের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, এটা সত্যিই কি ঘটছে? তখন তার প্রতি আমার ভেতর এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ জন্মাল।
দেশের একজন প্রধানমন্ত্রী হয়েও কতটা মানবিক, বিনয়ী ও সম্মানবোধসম্পন্ন ছিলেন তিনি।
হামিন আহমেদ লিখেছেন, তিনি কিন্তু চাইলে এসব নাও করতে পারতেন। তবুও তিনি করেছিলেন। এ জন্যই তিনি ছিলেন এবং থাকবেন, আমাদের হৃদয়ে, মানুষের হৃদয়ে বেগম খালেদা জিয়া। সন্ধ্যায় যখন আমরা গান পরিবেশন করি, তখন অনুষ্ঠানটি উপভোগ করেন তিনি এবং পরে আমাদের গানের প্রশংসা করেন। ওই দিনের সেই সুন্দর স্মৃতি আমাদের মনে স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়। বছরের পর বছর সেই স্মৃতি আমাদের এবং আমাদের পরিবারের, এমনকি আমার মায়ের ভেতরও তার প্রতি যে সম্মান, সেটি আরও দৃঢ় করে।
ব্যান্ড তারকা হামিন ও শাফিন আহমেদের মা বরেণ্য নজরুলসংগীতশিল্পী ফিরোজা বেগম। তাদের বাবা দেশের আরেক প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ব্যক্তি কমল দাশগুপ্ত। ফিরোজা বেগমের মৃত্যু হয় ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। তবে মৃত্যুর পর তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া হয়নি। এ নিয়ে তখন ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন খালেদা জিয়া। রাজধানীর ইন্দিরা রোডের কালিন্দী অ্যাপার্টমেন্টের ফিরোজা বেগমের বাসায় গিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছিলেন তিনি।
এ ব্যাপারে হামিন আহমেদ সেদিনের স্মৃতিও তুলে ধরেছেন ফেসবুক পোস্টে। তিনি লিখেছেন, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালে আমার মা ফিরোজা বেগম মারা যান, তখন আওয়ামী লীগ সরকারের সংস্কৃতমন্ত্রী ও ক’জন সিনিয়র রাজনীতিবিদ শহিদ মিনারে গিয়েছিলেন। যিনি আজীবন জাতীয় কবির গান ধারণ করেছেন এবং নজরুলসংগীতকে অন্য উচ্চতায় তুলে ধরেছেন, তাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কেউ আমার মায়ের বাসায় আসেননি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শুধু গণমাধ্যমে একটি বার্তা পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছিলেন।
এ ব্যান্ড সদস্য আরও লিখেছেন, আমার মায়ের জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা বা দাফনের ব্যবস্থা করা হয়নি। কিন্তু একজন মানুষ একমুহূর্ত দেরি না করে, অসুস্থতা ও শারীরিক কষ্ট হওয়ার পরও আমার মায়ের কালিন্দীর বাসায় এসেছিলেন। তিনি হচ্ছেন খালেদা জিয়া। তিনি আমাদের সঙ্গে বসেছিলেন, আমার মায়ের সঙ্গে তার স্মৃতি শুনিয়েছেন। আমাদের এমনভাবে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, যেন তিনি আমাদের পরিবারেরই একজন। তিনি অসাধারণ, মার্জিত ও মানবিক হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। সর্বোচ্চ সম্মান ও ভালোবাসা নিয়ে চিরকাল আমার স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন তিনি। আর এক আশ্চর্য কাকতালীয় ব্যাপার, খালেদা জিয়া তার জীবনের শেষ দিনগুলো এমন একটি বাড়িতে কাটিয়েছেন, যার নাম ছিল ফিরোজা।
এমকে/টিএ