এফএ কাপে চমক, চ্যাম্পিয়নদের ছিটকে দিল পাঁচ বছর বয়সী দল
ছবি: সংগৃহীত
০১:০১ এএম | ১১ জানুয়ারি, ২০২৬
রেফারির ম্যাচ শেষে বাঁশি বাজার পর ক্লাবটির সমর্থকদের চোখভরা ছিল অবিশ্বাস। মাত্রই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় অঘটনের স্বাক্ষীই যে হলো তারা। ১১৭ ধাপ এগিয়ে থাকা ক্লাবের বিপক্ষে জয়ের উদযাপন ছিল বাঁধনহারা।
এফ এ কাপে আজ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ক্রিস্টল প্যালকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস লিখেছেন ইংলিশ লিগে ষষ্ঠ সারির ক্লাব ম্যাকলেসফিল্ড এফসি। এফএ কাপের দীর্ঘ ইতিহাসে এত বড় ব্যবধানে থাকা কোনো দলের বিপক্ষে জয়ের প্রথম ঘটনা এটি। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের বিদায় করে দেওয়া এই জয়ে ক্লাবটি পৌঁছে গেছে এফ এ কাপের চতুর্থ রাউন্ডে।
স্বরণীয় এই জয়ের পরপরই অভিনন্দনের বার্তায় ভরে যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। প্যালেসের চেয়ে ১১৭ ধাপ নিচে থাকা ম্যাকলেসফিল্ড এফসি নিজেদের পোস্টে লিখেছে,
`সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ ডেভিড হারাল গলিয়াথকে! টাউন কাউন্সিল আরও যোগ করেছে, `এখনো কি বিশ্বাস হচ্ছে না? পুরো দল আর প্রতিটি স্টাফ সদস্যকে অভিনন্দন—দারুণ!’
ম্যাকলেসফিল্ডের উচ্ছসিত এক সমর্থক বলেন, ‘স্বপ্ন দেখতে আর বিশ্বাস করতে কখনো ভয় পেয়ো না। কী ফল, কী দল! গর্বে বুক ভরে গেছে, আবেগ সামলাতে পারছি না।’
কঠিন এক সময়েই নিজেদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই জয় পেয়েছে ম্যাকলেসফিল্ড। কদিন আগেই ক্লাবটির ফরোয়ার্ড ইউয়ান ম্যাকলিওড না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। মাত্র ২১ বছর বয়সে, ম্যাচ শেষে বাড়ি ফেরার পথে এক সড়ক দুর্ঘটনায় এক মাসেরও কম সময় আগে প্রাণ হারান তিনি।
ডিসেম্বরে বেডফোর্ড টাউনের বিপক্ষে ন্যাশনাল লিগ নর্থের ম্যাচ খেলে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ফরোয়ার্ড ইথান ম্যাকলিওডকে স্মরণ করে একজন লেখেন, ‘এই জয়টা ইথানের জন্য—অভিনন্দন।’
ঘরের মাঠ ন্যাশনাল লিগ নর্থে খেলা ‘দ্য সিল্কম্যান’রা তাদের ৫,৩০০ ধারণক্ষমতার মাঠ মস রোজে পল ডসন ও আইজ্যাক বাকলি-রিকেটসের গোলে বিদায় করে দেয় শিরোপাধারীদের।
সমর্থকদের উল্লাসে ভাসিয়ে ৪৩ মিনিটে ম্যাকলেসফিল্ডকে লিড এনে দেন মিডফিল্ডার পল ডসন। ক্রিস্টল প্যালেসের ডিফেন্ডার জেডি ক্যানভটের সঙ্গে সংঘর্ষে মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধেও নিখুঁত হেডে বল জালে পাঠান তিনি।
ম্যাচের মোড় ঘোরাতে বিরতিতে তিনটি পরিবর্তন আনেন প্যালেস কোচ অলিভার গ্লাসনার। জানুয়ারির নতুন সাইনিং ব্রেনান জনসন, মিডফিল্ডার উইল হিউজ ও ডিফেন্ডার টাইরিক মিচেল মাঠে নামেন। কিন্তু এই পরিবর্তনেও প্রাণ ফেরেনি নিষ্প্রভ সফরকারীদের খেলায়।

বরং ম্যাকলেসফিল্ডই ব্যবধান বাড়ানোর আরও কাছে পৌঁছে যায়। যখন জেমস এডমন্ডসনের জোরালো শট ঠেকাতে দারুণ সেভ করতে হয় প্যালেস গোলরক্ষক ওয়াল্টার বেনিতেজকে।
এর আগে টানা আট ম্যাচ জয়হীন থাকা স্বাগতিকরা ৬০ মিনিটে যেন স্বপ্নের জগতে পৌঁছে যায়। ফরোয়ার্ড আইজ্যাক বাকলি-রিকেটস দুর্দান্ত এক শটে ব্যবধান ২-০ করেন। ম্যাচের শেষদিকে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া প্যালেস লড়াইয়ে ফেরার চেষ্টা করে। ৯০ মিনিটে ইয়েরেমি পিনোর নেওয়া অসাধারণ ফ্রি-কিক গোলরক্ষক ম্যাক্স ডিয়ার্নলিকে পরাস্ত করলে উত্তেজনাপূর্ণ সমাপ্তির ইঙ্গিত মেলে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত দৃঢ়তা দেখিয়ে ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করে ম্যাকলেসফিল্ড। ম্যাচ শেষ হওয়ার পরই সমর্থকরা মাঠে ঢুকে পড়েন আনন্দে, আর গ্যালারিতে উপস্থিত ওয়েন রুনি চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি—তার ভাই জন রুনির কোচিংয়েই এফএ কাপের ইতিহাসে সম্ভবত সর্বকালের সেরা অঘটনের একটি রচিত হয়।
ম্যাকলেসফিল্ড এফসিকে একটি ফিনিক্স ক্লাবও বলা যায়। এর পূর্বসূরি ম্যাকলেসফিল্ড টাউন এফসি ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং দীর্ঘদিন ইংলিশ ফুটবলের নিচের স্তরগুলোতে খেলেছে। তবে গুরুতর আর্থিক সংকট, খেলোয়াড় ও স্টাফদের বকেয়া বেতন এবং কর সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ক্লাবটি ২০২০ সালে ইংল্যান্ডের হাইকোর্টের আদেশে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
ঠিক সেই শূন্যতা থেকেই একই বছর স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সমর্থকদের উদ্যোগে ম্যাকলেসফিল্ড এফসি গঠিত হয়। নতুন ক্লাবটি সম্পূর্ণ আলাদা আইনি সত্তা হলেও শহরের ফুটবল ঐতিহ্য ধরে রাখার লক্ষ্যে আগের মাঠ মস রোজ এই খেলতে শুরু করে। তারা একেবারে নিচের স্তর, নর্থ ওয়েস্ট কাউন্টিজ লিগ থেকে যাত্রা শুরু করে এবং অল্প সময়ের ন্যাশনাল লিগ নর্থে উঠে আসে। ঘুরে দাড়ানোর এই গল্পে ক্লাবটি পূর্ণতা দিল ঐতিহাসিক এক জয়ে।
টিজে/টিএ