‘হক’র আলোয় ফিরে দেখা ইতিহাস বদলে দেয়া ‘শাহ বানো’ মামলা

সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘হক’কে ঘিরে ফের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে এক ঐতিহাসিক নাম ‘শাহ বানো’। ইতিহাস যে কেবল অতীতের পাতায় বন্দি থাকে না বরং সময়ের সঙ্গে ফিরে আসে তারই যেন এক উজ্জ্বল উদাহরণ ‘হক’।

বর্তমান প্রজন্মের কাছে ‘শাহ বানো’ নামটি পরিচিত না হলেও আশির দশকে প্রতিটি মানুষের স্মৃতিতে শাহ বানো মামলা এক গভীর ছাপ রেখে গেছে। এই লেখায় ফিরে দেখা যাক সেই মামলা ও তৎকালীন ভারতের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

১৯৩২ সালে শাহ বানোর সাথে ইন্দোরের প্রখ্যাত আইনজীবী মোহাম্মদ আহমেদ খানের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে পাঁচ সন্তান ছিল তিন পুত্র ও দুই কন্যা নিয়ে। বড় মেয়ের বিয়েও হয়ে গিয়েছিল। এই সময়েই মোহাম্মদ আহমেদ খান স্ত্রীকে তিন তালাক দেন। তখন শাহ বানোর বয়স ৬২ বছর। তালাকের পর স্ত্রীকে কোনো খোরপোশ দিতে অস্বীকার করেন আহমেদ। বাধ্য হয়েই ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে আদালতের দ্বারস্থ হন শাহ বানো।

উল্লেখ্য, তালাকের তিন বছর আগেই আহমেদ খান শাহ বানোকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিলেন। ততদিনে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করে সেই বাড়িতেই থাকা শুরু করেন।

শাহ বানো সেসময় প্রচলিত নারীদের সব মেনে নেয়ার বেড়াজাল ভেঙে নিজের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নামে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারায় নিজের এবং পাঁচ সন্তানের জন্য ভরণপোষণের দাবি জানান। ওই ধারায় স্পষ্ট বলা ছিল স্ত্রীর উপার্জনের কোনো ব্যবস্থা না থাকলে স্বামী বিবাহিত অবস্থায় এবং বিচ্ছেদের পরেও স্ত্রীকে খোরপোশ দিতে বাধ্য।

এই দাবির বিরোধিতা করেন মোহাম্মদ আহমেদ খান। তার মতে, ‘মুসলিম পার্সোনাল আইনে ভরণপোষণের এমন কোনো বিধান নেই। তালাকের পর কেবলমাত্র ইদ্দত পর্বে খোরপোশ দেয়া বাধ্যতামূলক।’



ইদ্দত বলতে বোঝায় স্বামীর মৃত্যু বা তালাকের পর একজন নারীর আবার বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়কাল। সাধারণত এই সময় তিন মাসের বেশি হয় না। তবে মহিলা অন্তঃসত্ত্বা হলে সন্তান জন্ম পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেয়ার বিধান রয়েছে।

আহমেদের দাবিকে সমর্থন করে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড। তারা জানায়, ১৯৩৭ সালের শরিয়ত আইন অনুযায়ী এই বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপের অধিকার নেই। বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অধীনে।

১৯৮৫ সালে এই মামলায় ঐতিহাসিক রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। আদালত জানায়, ১৯৭৩ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত ভারতীয় নাগরিকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওয়াই ভি চন্দ্রচূড় হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন এবং শাহ বানোকে ভরণপোষণ দেয়ার নির্দেশ দেন। শুধু তাই নয়, সুপ্রিম কোর্ট ভরণপোষণের পরিমাণও বৃদ্ধি করে।

আজও এই রায়কে ভারতের বিচারব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয় একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যার গুরুত্ব অপরিসীম।

তবে এখানেই ঘটনার শেষ হয়নি। ১৯৮৬ সালে কেন্দ্রীয় সরকার মুসলিম মহিলা (তালাকের সুরক্ষা) আইন পাস করে।

এই আইনে শাহ বানো মামলার রায় বাতিল করা হয়। এবং সেখানে ফের পুরনো কথা ফিরিয়ে এনে বলা হয় কেবলমাত্র ইদ্দতের সময়ই ভরণপোষণ দেয়ার দায় থাকবে স্বামীর। পাশাপাশি বলা হয়, ইদ্দত পর্বের পর যদি মহিলা উপার্জনক্ষম না হন তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াকফ বোর্ডকে নির্দেশ দিতে পারেন ওই মহিলা ও তার উপর নির্ভরশীল সন্তানদের জীবিকার ব্যবস্থা করার জন্য। সেই সময় কেন্দ্রের ক্ষমতায় ছিল রাজীব গান্ধী সরকার এবং এই আইন নিয়ে সরকারের ওপর প্রবল রাজনৈতিক চাপে পড়ে।

এই আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেন শাহ বানোর আইনজীবী দানিয়াল লাতিফি। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, নতুন আইন মেনেও ব্যাখ্যা করা যায় যে স্বামীর দায় কেবল ইদ্দত পর্বে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। নারী-পুরুষের সাম্য, বিশেষত বিবাহ ও বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে, এই রায়কে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়। যদিও পরবর্তীকালে শাহ বানো নিজেই হঠাৎ ভরণপোষণের দাবি থেকে সরে আসেন।

এরপর সময় এগিয়ে যায় ২০১৯ সালে। দ্বিতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় আসে মোদি সরকার। ওই বছরের ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হয় ‘মুসলিম নারী (বিবাহ অধিকার সুরক্ষা) আইন, ২০১৯’। এই আইনে বলা হয়, তাৎক্ষণিক তিন তালাক দিলে স্বামীর তিন বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান থাকবে। এর আগেই, ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট তাৎক্ষণিক তিন তালাককে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করেছিল। নতুন আইনে স্পষ্ট করা হয় বিবাহ বিচ্ছেদের পরেও মুসলিম নারী ও তাদের সন্তানদের ভরণপোষণের অধিকার রয়েছে।

তবে এই ঐতিহাসিক রায় শাহ বানো দেখে যেতে পারেনি। উচ্চ রক্তচাপ ও দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। অনেকের মতে, দেশজুড়ে চলতে থাকা বিতর্কের জেরেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছিল।

শাহ বানো আজ আর নেই কিন্তু ভারতে নারীর অধিকার, সমতা ও ন্যায়ের প্রশ্নে তার নাম চিরকাল অমলিন থাকবে। মেয়েদের অধিকার রক্ষার ইতিহাসে শাহ বানোকে বাদ দিয়ে কোনো আলোচনা কখনোই সম্পূর্ণ হতে পারে না।

এমআই/এসএন

Share this news on:

সর্বশেষ

img
বার্সেলোনার টানা ১১ জয়ের পরও ফ্লিক বললেন, এটা ‘কিছুই না’ Jan 16, 2026
img
৮০০ বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করেছে ইরান: হোয়াইট হাউস Jan 16, 2026
বেগম জিয়াকে নিয়ে যে স্মৃতিচারণ শফিকুর রেহমানের Jan 16, 2026
কীভাবে নোবেল পেলেন ট্রাম্প? বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্ক Jan 16, 2026
img
বন্দি থাকাকালে বেগম জিয়ার পক্ষে কথা বলার কেউই ছিলেন না: আসিফ নজরুল Jan 16, 2026
img
কিছু কেন্দ্রে আগের রাতেই সিল মেরে রাখার চিন্তা করা হচ্ছে: রুমিন ফারহানা Jan 16, 2026
img
‘ভারতে যত ছাগল কোরবানি হয়, পাকিস্তানে তত লোকও নেই’ Jan 16, 2026
img
ঢাকায় আসছেন আইসিসির দুই কর্মকর্তা,বৈঠকে থাকবে সরকারের প্রতিনিধিও Jan 16, 2026
img

বিপিএল ২০২৬

বিপিএল থেকে প্রথম বিদায় নোয়াখালীর Jan 16, 2026
img
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর প্রচারণা চালানো রাষ্ট্রের জন্য ফরজে কেফায়া: স্বাস্থ্য উপদেষ্টা Jan 16, 2026
img
খারাপ ক্রিকেট খেলিনি, ভাগ্য সহায় ছিল না: রংপুরের অধিনায়ক লিটন Jan 16, 2026
img
মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের ই-পাসপোর্ট ফি পুনর্নির্ধারণ Jan 16, 2026
img
ঢাকায় বিপিএল ‘ফেরার’ দিনে স্টেডিয়ামে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় Jan 16, 2026
img
সালাহর লিভারপুলে ফেরা নিয়ে কোচের মন্তব্য Jan 16, 2026
img
ইউরোপে পরমাণু হামলার সময়সীমা নিয়ে পুতিনের সাবেক উপদেষ্টার মন্তব্য Jan 16, 2026
img
তোপের মুখে ইনস্টাগ্রাম বন্ধ করে দিলেন ‘টক্সিক’ এর সেই নায়িকা Jan 16, 2026
img
'ইসলামের পথ থেকে সরে গেছে জামায়াত, তাই ইসলামী আন্দোলনও জোট থেকে বেরিয়ে গেছে' Jan 16, 2026
img
রাষ্ট্রের ক্ষমতা কমিয়ে জনগণের ক্ষমতা বাড়াতে হবে: আমীর খসরু Jan 16, 2026
img
এসএসসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ, মানতে হবে গুরুত্বপূর্ণ ১৩ নির্দেশনা Jan 16, 2026
নাচে গানে ভরপুর পূজা চেরির ‘ভাইরাল’ গায়ে হলুদ! Jan 16, 2026