ময়মনসিংহে বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে প্রায় ১৮ হাজার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে। প্রতিদিন গড়ে আদালতে জমা পড়ছে ১৫ থেকে ২০টি বিচ্ছেদের আবেদন। একসময় যে সম্পর্কের শুরু হয়েছিল ভালোবাসা এবং রঙিন স্বপ্নের সঙ্গে, আজ তা শেষ হচ্ছে নীরব আদালতের কক্ষে, সমাজের চোখে অদৃশ্য হয়ে।
স্থানীয়রা বলছেন, পরিবার ভাঙনের পেছনে মূল কারণগুলো হলো পরকীয়া, বাল্যবিয়ে, পারিবারিক সহিংসতা, দারিদ্র্য, মাদকাসক্তি এবং জুয়া। একজন বিবাহবিচ্ছেদের অভিযোগকারী বলেন, “টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। টাকা নেওয়ার পর আমার বাচ্চা পেটে থাকা অবস্থায় স্বামী আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। বাবা-মা বিয়ে করেছিলেন ভালোর জন্য, কিন্তু এখন সে অন্য এক নারীর দিকে ঝুঁকছে।”
ময়মনসিংহ জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, “বিভিন্ন বড় ইস্যুর পাশাপাশি অনেক সময় ছোটোখাটো কারণেই বিবাহবিচ্ছেদ হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টরগুলো হলো পরকীয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্তি এবং বাল্যবিবাহ। এই সমস্যাগুলো সম্পর্কের ভিত দুর্বল করছে।”
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বিবাহবিচ্ছেদের প্রভাব শুধুমাত্র দম্পতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এতে সন্তানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে এবং সমাজের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ময়মনসিংহ মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের উপ-পরিচালক নাজনীন সুলতানা জানান, “অভিযোগ শুনানির জন্য বাদী ও বিবাদী পক্ষকে ডাকা হলে প্রথমে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। যদি মীমাংসা সম্ভব না হয়, তখনই বিচ্ছেদের পরামর্শ দেয়া হয়।”
ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, “যদি ব্যক্তি নিজস্ব নৈতিক মূল্যবোধ বজায় রাখতে পারে এবং পরস্পরের প্রতি সহনশীল হয়, তাহলে বিবাহবিচ্ছেদ কমানো সম্ভব। বোঝাপড়া এবং সমঝোতা বজায় রাখা দম্পতির জন্য অত্যন্ত জরুরি।”
ময়মনসিংহ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “পারিবারিক সম্পর্ক ভেঙে গেলে সামাজিক অবক্ষয় ঘটে এবং মানুষ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তাই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এই পবিত্র সম্পর্ক রক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিবাহবিচ্ছেদ রোধে শুধুমাত্র সচেতনতা যথেষ্ট নয়। সমাজের বিভিন্ন স্তরে পারিবারিক মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষার প্রসার, বাল্যবিবাহ বন্ধ করা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ন্যায়পরায়ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ ধরণের পদক্ষেপই দম্পতির মধ্যে বোঝাপড়া বাড়িয়ে, সমাজে স্থিতিশীলতা এবং সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
মোটের ওপর, ময়মনসিংহের বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, এক সময়ের রঙিন স্বপ্ন এখন নীরব আদালতের কক্ষে কাগজের শীটে আটকে যাচ্ছে। সমাজ ও পরিবার সচেতন না হলে, এই বৃদ্ধিপ্রবণ বিচ্ছেদের হার ভবিষ্যতে আরও উদ্বেগজনক রূপ নিতে পারে।
এসকে/এসএন