ইরানকে নিয়ে নতুন দুনিয়া গড়তে চান পুতিন

ইরানকে সাথে নিয়ে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়তে চান পুতিন। আজ রোববার (১৮ জানুয়ারি) প্রকাশিত অস্ট্রেলিয়ার এবিসি সংবাদ মাধ্যমে রাইলি স্টুয়ার্ট এর লেখায় উঠেছে এসেছে এমন এক আভাস।

তেহরান শহর ছিল ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু কিন্তু এর প্রভাব মস্কোতেও স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে।

ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান এখন রাশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত অংশীদার। ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য, এ পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এখনও তার মিত্রকে ঘিরে চলা বিক্ষোভ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিনি এটি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন।

ইরানে প্রশাসন পরিবর্তন, পুতিনের জন্য কমপক্ষে অপ্রিয় হবে। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এটি ক্রেমলিনের `সবচেয়ে বড় ভয়' কে বাস্তবায়ন করতে পারে।

ইরানের নেতৃত্ব দমন অভিযান চালিয়েও বিক্ষোভ দমন করতে হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছেন।

মার্কিন সিনিয়র বিশ্লেষকদের মতে, ‘আগেও ইরানে বিক্ষোভ হয়েছে, এবং রাশিয়া সবসময় তা পর্যবেক্ষণ করেছে, তবে কখনও সরাসরি প্রতিক্রিয়া দেখায়নি, কারণ তারা সম্ভবত আশা করেছিল যে ইরানের প্রশাসন চাপ সহ্য করতে পারবে। কিন্তু এবার চাপ বাড়ছে, এবং এটা শুধু দেশীয় নয়, বহিরাগতও।’

এখন পর্যন্ত, ক্রেমলিনের প্রতিক্রিয়া পূর্বানুমানযোগ্য। তারা যা বলেছে বা করেছে, তা খুব কম।

বুধবার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে প্রথমবারের মতো মন্তব্য করেছেন এবং তাতে মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে সমালোচনা করেছেন।

তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি না কোনো তৃতীয় পক্ষ মস্কো ও তেহরানের সম্পর্কে মৌলিক পরিবর্তন করতে পারবে।’

এই অবস্থান সেই প্রেক্ষাপটে দুর্বল মনে হয়, যা গত এক বছর বা তার বেশি সময়ে ভৌগোলিক রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ইউক্রেনে আক্রমণে ব্যস্ত রাশিয়া, গত ১৩ মাস ধরে, তার কিছু নিকটতম মিত্রকে ক্ষমতাচ্যুত হতে দেখেছে। যদি পরবর্তী হয় তেহরান, তাহলে তা হবে সবচেয়ে বড় ‘ডোমিনো’।

ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ-

পুতিনের জন্য ইরান কেন গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝার জন্য অন্য সম্পর্কগুলোও দেখার দরকার, যা বাইরের শক্তির কারণে বিপর্যস্ত হয়েছে।

ডিসেম্বর ২০২৪-এ মস্কোর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটা ধাক্কা আসে যখন বিদ্রোহীরা সিরিয়ার বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে- যিনি ছিলেন ক্রেমলিনের বিশ্বস্ত মিত্র। রাশিয়া আসাদের প্রশাসনকে উল্লেখযোগ্য সামরিক সহায়তা প্রদান করেছিল এবং নতুন প্রশাসনের আগমন সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে বাধ্য করেছে।

যদিও রাশিয়া এখনো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং সিরিয়ায় বিমান ও নৌ ঘাঁটি রয়েছে, তবে নতুন সরকার পুতিনের শত্রুদের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থাপন করেছে।

রপর, এই মাসে, মার্কিন বাহিনী রাশিয়ার ল্যাটিন আমেরিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসাবে বিবেচিত ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে একটি সামরিক অভিযান চালিয়ে তুলে আনে। সেখানে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ট্রাম্প বলেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিচালনা করবে দেশটি।

মস্কো অর্থনৈতিক ক্ষতি খুব বেশি ভোগ না করলেও, পরিস্থিতি পুতিনের জন্য বিব্রতকর এবং রাশিয়াকে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে তুলবে।

মাদুরোকে রক্ষা করার জন্য নির্মিত রাশিয়ান এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেমগুলো মার্কিন আক্রমণের সময় ছিল নিষ্ক্রিয়। কিছু সূত্রে বলা হয়েছে যে, দু’দেশেই অযোগ্যতার কারণে সেগুলো ঠিকভাবে স্থাপন করতে পারেনি। সিরিয়া এবং ভেনেজুয়েলা ক্রেমলিনের জন্য অনতিক্রমনীয় ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তবে মস্কোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ইরানের কথা ভিন্ন।

অর্থনৈতিকভাবে বা বাণিজ্যিকভাবে যতটুকু গুরুত্ব তার চেয়ে তারা অপরকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করেছে। বরং বাণিজ্য কতটুকু হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ।

ইরান রাশিয়াকে সামরিক সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তি সরবরাহে বড় ভূমিকা রাখে, যদিও ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি এ কথা অস্বীকার করে।

ক্রেমলিন ইউক্রেনে ইরানের শাহেদ ড্রোন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। যুদ্ধকালীন সময়ে, ইরান রাশিয়াকে স্বতন্ত্রভাবে এগুলো উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনে সাহায্য করেছে, কিন্তু পুতিনের কাছে সম্পর্কের মূল্য কোনো অর্থনৈতিক বা সামরিক সুবিধার চেয়ে অনেক বেশি। ইরান ক্রেমলিনের বৃহত্তর ভূ-রাজনীতিতে সর্বশেষ অবলম্বন।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো অ্যানা বোর্শচেভস্কায়া বলেন, রাশিয়া মূলত একটি ভিন্ন ধরনের বিশ্বব্যবস্থা গড়তে চায়। যেখানে নিজেকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে ‘মহাশক্তিধর’ সবাইকে তাদের পেছনে ফেলতে চায়।’

তিনি আরো বলেন, এটি এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি যা ‘মুক্ত বিশ্বের’ সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে বিরোধপূর্ণ। যাদের বদৌলতে আজ আমরা এখানে এসেছে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ‘অসংগতিপূর্ণ’। ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা পুতিনের এ ধাঁধার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কারণ পুতিনের মতোই এই বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার জন্য তার দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে। মধ্যপ্রাচ্যকে এ বিশাল লক্ষ্য অর্জনে সাহায্যের বিনিময়ে যা কিছু দরকার তার সব দিতে প্রস্তুত রাশিয়া।

তেহরান এবং মস্কোর সম্পর্কের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গত বছর দুই দেশের মধ্যে একটি ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও, যা আগামী দুই দশকের সম্পর্কের রূপরেখা নির্ধারণ করার মতো দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই।

রাশিয়াও চায় না যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করুক। এটি স্পষ্টভাবে দেখা গেছে গত বছর ইরান যখন ইসরায়েল এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘১২ দিনের যুদ্ধ’ লড়েছিল। রাশিয়া তখন কেবল পর্যবেক্ষক হিসেবে ছিল যখন তার মিত্র তেহরান মার খাচ্ছিল।

বিশ্লেষকরা বিতর্ক করেছেন যে ক্রেমলিন সাহায্য করতে অক্ষম ছিল নাকি অনীহা ছিল। পুতিন দাবি করেছেন, ইরান কখনো সাহায্যের জন্য আবেদন করেনি।

যদি তেহরানের শাসনে পরিবর্তন ঘটে, তাহলে কোনো নিশ্চয়তা নেই যে তা কেমন হবে এবং নতুন সরকার রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে নাকি দুর্বল করবে।

ইরানের প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল দেশের মুদ্রার পতনের ক্ষোভের কারণে, এবং তারপর তা বিস্তৃত হয়ে দুর্নীতি এবং অন্যান্য বিষয়ে।

এগুলোই এমন অভিযোগ যা তেহরানে শাসন পরিবর্তনের ইঙ্গিত। রাশিয়ার জন্য তা হতে পারে ইরান থেকে সম্পূর্ণভাবে দূরে সরে যাওয়া। যা পুতিনের জন্য সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি’ বলেছেন বোরশচেভস্কায়া।

সূত্র: অস্ট্রেলিয়ার এবিসি সংবাদ মাধ্যম

পিএ/এসএন

Share this news on:

সর্বশেষ

img
ইউরোপের ৮ দেশের ওপর বাড়তি শুল্কের হুমকি ট্রাম্পের Jan 18, 2026
img
যত বাধা আসুক সব বাধা মোকাবিলা করতে সরকার প্রস্তুত: উপদেষ্টা রিজওয়ানা Jan 18, 2026
img
রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে 'মব' সৃষ্টির অভিযোগ, ব্যবস্থা নিতে চিঠি Jan 18, 2026
img
নতুন সার্টিফিকেশন বোর্ডে ফিরলেন খিজির-নওশাবা Jan 18, 2026
img
সরকার নির্বাচনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত: ডা. রিজওয়ানা হাসান Jan 18, 2026
img
আবদুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থিতা বহাল Jan 18, 2026
লন্ডনে খালেদা জিয়ার সঙ্গে যে স্মৃতি শোনালেন জাইমা রহমান Jan 18, 2026
img
মাদারীপুরে বাস-অটোরিকশা সংঘর্ষ, প্রাণ হারাল ৬ Jan 18, 2026
যুক্তরাজ্যসহ ৮ দেশের ওপর বিশাল শুল্ক আরোপ করলেন ট্রাম্প Jan 18, 2026
দেশে প্রথমবার বক্তৃতায় দাঁড়িয়ে যে কথা বললেন জাইমা রহমান Jan 18, 2026
শাকিব খানের সাথে কাজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন এই মডেল Jan 18, 2026
img
চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাক্ষাৎ Jan 18, 2026
মঞ্চে আবেগে আপ্লুত হয়ে গেলেন অভিনেত্রী দিলারা জামান Jan 18, 2026
দেবের নামে চালু হলো বিশেষ ডাকটিকেট Jan 18, 2026
img
কুড়িগ্রাম-৩ আসনে জামায়াতের মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়ন বৈধ Jan 18, 2026
বিউটি কনটেস্টে নিজেকে উপস্থাপনার কৌশল জানালেন তমা রশিদ Jan 18, 2026
লা লিগায় এমবাপ্পে-অ্যাসেনসিওর গোলে লেভান্তেকে হারাল রিয়াল মাদ্রিদ Jan 18, 2026
img
বার্সায় বড় ধাক্কা, ছিটকে গেলেন রাফিনিয়া Jan 18, 2026
img
ভোটকেন্দ্রে যাওয়াই গণতন্ত্র রক্ষার একমাত্র পথ: ইশরাক হোসেন Jan 18, 2026
img
খালেদা জিয়া দেশের জনগণের হৃদয়ের স্পন্দন হয়ে থাকবেন : মান্নান Jan 18, 2026