মাগুরার চারটি উপজেলার মধ্যে শালিখায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা। সামাজিক অস্থিরতা, ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা, উচ্চবিলাসিতা, দাম্পত্য কলহ, পরকীয়া, ভুল বোঝাবুঝি ও মতভেদের কারণে ভেঙে যাচ্ছে বহু সংসার। দাম্পত্য জীবনের পরিসমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়। বিচ্ছেদের পর স্বামী-স্ত্রী আলাদা হলেও সবচেয়ে বেশি অনাদর ও অবহেলার শিকার হচ্ছে সন্তানরা, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাদের শৈশব।
শালিখা উপজেলার মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রারদের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অধিকাংশ তালাকের নোটিশ আসছে নারীদের পক্ষ থেকে। তালাকপ্রাপ্ত নারীদের বয়স সাধারণত ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শালিখা উপজেলার সাত ইউনিয়নে মোট ৫৮১টি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে সম্পন্ন হয়েছে ১ হাজার ৪২টি নিকাহ। ইউনিয়নভিত্তিক তালাকের সংখ্যা হলো- তালখড়ি ১৪৪টি, শতখালী ১২২টি, গঙ্গারামপুর ২৪টি, আড়পাড়া ১০৪টি, বুনাগাতী ৬৪টি, শালিখা ৭৯টি ও ধনেশ্বরগাতী ৪৪টি।
এর আগের বছর ২০২৪ সালে উপজেলার সাত ইউনিয়নে মোট ৫১১টি তালাকের ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে নিকাহ সম্পন্ন হয়েছিল ৮৫২টি। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৪৮টি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে।
২০২৫ সালের তালাকের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছেলে পক্ষ থেকে তালাক হয়েছে ৩৮টি, উভয় পক্ষের সম্মতিতে মিউচুয়াল তালাক হয়েছে ১৯৩টি এবং নারী পক্ষ থেকে ‘ডি’ তালাক হয়েছে ৩৪৮টি, যা পুরুষ পক্ষের তুলনায় প্রায় নয় গুণ বেশি। তালাকের সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছে তালখড়ি ইউনিয়ন, আর সবচেয়ে কম বিচ্ছেদ ঘটেছে গঙ্গারামপুর ইউনিয়নে।
শালিখার আড়পাড়া ইউনিয়নের মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার রোকনুজ্জামান বলেন, অধিকাংশ বিবাহ বিচ্ছেদের পেছনে রয়েছে পরকীয়া সম্পর্ক। এছাড়া পারিবারিক বনিবনার অভাব, স্বামীর দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা, সামাজিক অবক্ষয়সহ নানা কারণও দায়ী।
আড়পাড়া ইউনিয়নের পুকুরিয়া গ্রামের বিলকিস খাতুন (ছদ্মনাম) বলেন, তার স্বামী মাদকাসক্ত, আয়-রোজগারহীন এবং শারীরিকভাবে নির্যাতন করতেন। এসব কারণে তিনি তালাকের সিদ্ধান্ত নেন। অন্যদিকে বুনাগাতী ইউনিয়নের দেশমুখপাড়া গ্রামের সুমন ইসলাম (ছদ্মনাম) জানান, স্ত্রীর অতিরিক্ত ফেসবুক ও টিকটক আসক্তির কারণে দাম্পত্য কলহ তৈরি হয়। মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়াকে কেন্দ্র করে স্ত্রী চলে যায় এবং পরে ডিভোর্স লেটার পাঠায়।
এ বিষয়ে শালিখা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা আব্দুল আওয়াল (অতি. দা.) বলেন, বিবাহ বিচ্ছেদ রোধে আমরা মাঝে মাঝে উঠান বৈঠক করে থাকি। তবে এসব বিষয় মূলত ইউনিয়ন পরিষদের আওতাভুক্ত।
তালাক বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে শালিখা উপজেলা কোর্ট মসজিদের খতিব মুফতি মোশারফ হোসেন কাসেমী বলেন, ইসলামি বিষয়ে অজ্ঞতা, পরকীয়া, পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি এবং ধর্মীয় বিধি-বিধান না মানার কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ছে। এর ফলে সামাজিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি মানুষের মানসিক চাপও বেড়ে যাচ্ছে।
বিবাহ বিচ্ছেদের এই ঊর্ধ্বগতি শালিখা উপজেলার সামাজিক কাঠামোর জন্য একটি গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সচেতন মহলের মতে, পরিবার ভেঙে গেলে তার প্রভাব শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে সামাজিক স্থিতিশীলতা, নৈতিকতা ও পারিবারিক বন্ধন মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।
তারা আরও বলেন, বিবাহ বিচ্ছেদ রোধে পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ জোরদার করা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
আরআই/টিকে