নেত্রকোণার কলমাকান্দা উপজেলার লেংগুড়া ইউনিয়নের দুইবারের নির্বাচিত সফল চেয়ারম্যান এবং উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান ভূঁইয়াকে পরিকল্পিতভাবে বরখাস্ত করার অভিযোগ উঠেছে। মাত্র ৫০ টাকা জরিমানাকে কেন্দ্র করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সাথে আলোচনা করতে চাওয়া এবং তার জের ধরে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে এই বরখাস্ত করা হয়। ইউএনওর এমন পদক্ষেপকে নজিরবিহীন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার চরম অপব্যবহার হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
জানা যায়, গত ১৭ জানুয়ারি কলমাকান্দা উপজেলার লেংগুরা বাজারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাসুদুর রহমান ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুল হাসান মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে যান। এসময় পারভেজ নামের এক ব্যক্তিকে অবৈধভাবে ঘর মেরামতের দায়ে ৫০ টাকা জরিমানা ধার্য করেন। এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান ভূঁইয়া যৌক্তিক প্রশ্ন তুললে ইউএনও চরমভাবে ক্ষিপ্ত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এক পর্যায়ে ইউএনও মেজাজ হারিয়ে চেয়ারম্যানের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং এলাকা ত্যাগ করার সময় প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আপনাকে দেখে নেব’।
ইউএনওর সেই হুমকির প্রতিফলন ঘটে ঠিক তার পরদিন অর্থাৎ ১৮ জানুয়ারি। কোনো প্রকার সুষ্ঠু তদন্ত বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই অত্যন্ত দ্রুততার সাথে মন্ত্রণালয় থেকে সাইদুর রহমান ভূঁইয়াকে চেয়ারম্যান পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একজন দুইবারের নির্বাচিত জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধিকে এভাবে তুচ্ছ কারণে তাৎক্ষণিক অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় জনগণের মনে ক্ষোভের দানা বেঁধেছে।
ঘটনার নাটকীয়তা বাড়ে সোমবার (১৯ জানুয়ারি)। চেয়ারম্যানকে অব্যাহতির মাত্র একদিন পরই কলমাকান্দা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে লেংগুড়া ইউনিয়নের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উক্ত কর্মকর্তা বিগত ফ্যাসিস্ট রেজিমের সরাসরি সুবিধাভোগী এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট। একজন জনপ্রিয় চেয়ারম্যানকে সরিয়ে কেন তড়িঘড়ি করে একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে প্রশাসক করা হলো, তা নিয়ে পুরো উপজেলায় চলছে তীব্র সমালোচনা।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মোবাইল কোর্ট চলাকালীন ইউএনও যে আচরণ করেছেন তা কোনোভাবেই একজন সরকারি কর্মকর্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, ইউএনও সাহেব তুচ্ছ কারণে একজন নিরীহ মানুষকে জরিমানা করেছিলেন। চেয়ারম্যান সাহেব জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে শুধু বিষয়টি নিয়ে তিনি আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। এই আলোচনার প্রস্তাবও ইউএনও ব্যক্তিগতভাবে নেন এবং চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। ইউএনও সাহেব তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। আমরা কল্পনাও করিনি যে পরের দিনই তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।
বিষয়টি জানতে বরখাস্তকৃত চেয়ারম্যানের স্থলাভিষিক্ত উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিমকে ফোন করলে তিনি ‘ব্যস্ত’ বলে পরে যোগাযোগ কারার পরামর্শ দিয়ে ফোন কেটে দেন।
এদিকে জনপ্রিয় এই চেয়ারম্যানের ওপর এমন অন্যায় ও প্রতিহিংসামূলক আচরণের প্রতিবাদে লেংগুড়া ইউনিয়নসহ পুরো উপজেলায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের দাবি, কলমাকান্দার ইউএনও প্রশাসনিক ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করেছেন। তারা অবিলম্বে সাইদুর রহমান ভূঁইয়ার বরখাস্তাদেশ প্রত্যাহার এবং ক্ষমতার দাপট দেখানো ইউএনওর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে অব্যাহতি হওয়া ভুক্তভোগী চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান ভূঁইয়া দেশের একটি গণমাধ্যমকে বলেন, আমি এই এলাকার চেয়ারম্যান। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে ঘটনাটি জানতে গিয়েছিলাম। কেউ অপরাধ করলে ইউএনও সাহেব ব্যবস্থা নিতেই পারেন। কিন্তু চেয়ারম্যান হিসেবে বিষয়টি জানতে চাওয়া কি আমার অপরাধ?
তিনি আরও বলেন, ‘সবার সামনে আমাকে অপমান করেন, দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। শেষপর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাকে বহিষ্কার করলেন। এভাবে বহিষ্কার করা ন্যায়সংগত মনে করি না। ইউএনও তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাসুদুর রহমান বলেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (সাময়িক বরখাস্তকৃত) বাধা দেন। এটার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চান। সে অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিয়েছেন। ক্ষোভের বা ক্ষমতা দেখানোর কোনো প্রশ্নই আসে না।
তিনি আরও বলেন, উনি (বরখাস্তকৃত চেয়ারম্যান) জনপ্রতিনিধি হিসেবে আইনি কাজে সহযোগিতা করার পরিবর্তে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছেন। আর উনাকে তো কোনো দণ্ড দেওয়া হয়নি।
এদিকে, উপজেলার ইউএনও’র অফিসিয়াল ফেসবুকে এক পোস্টে ইউএনও মাসুদুর রহমান লিখেছেন, ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। এ রাষ্ট্র আপনার, আমার, আমাদের সকলের।
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমাদের মহান শহীদরা নিজেদের রক্ত দিয়ে যে পথ দেখিয়ে গেছেন, সে পথ ধরেই অব্যাহত থাকবে আমাদের পথচলা ইনশাআল্লাহ।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘একমাত্র মৃত্যুই আমাদের এ পথচলাকে থামাতে পারে। আর মৃত্যুর ফয়সালা হয় আসমানে। লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লা বিল্লা।’
কেএন/টিকে