গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পর জামিন পেলেন সিমিন রহমান

ভুয়া স্বাক্ষর ও স্ট্যাম্প জালিয়াতি করে ট্রান্সকম গ্রুপের ১৪ হাজার ১৬০টি শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির সিইও সিমিন রহমান ও তার মা মিসেস শাহনাজ রহমান।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালত শুনানি শেষে তাদের জামিন মঞ্জুর করেন। এর আগে সকালে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহের আদালত এই মামলায় ৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আমলে নেন। তবে আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় সিমিন রহমান ও তার মা শাহনাজসহ তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেওয়া আরেকজন হলেন ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক সামসুজ্জামান পাটোয়ারী।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, বুধবার এই মামলায় অভিযুক্ত ৬ আসামির মধ্যে ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক মো. কামরুল হাসান, মো. মোসাদ্দেক, আবু ইউসুফ মো. সিদ্দিক আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাদের আইনজীবী স্থায়ী জামিন চেয়ে আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। তবে সিমিন রহমানসহ তিন আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।

এ জন্য তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করা হয়। পরে ‍বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সিমিন রহমান ও তার মা শাহনাজ আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এ সময় তারা কালো বোরকা পরে ও মুখ ঢেকে আদালতে উপস্থিত হন।

তাদের পক্ষে আইনজীবীরা আদালতে জামিন আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত ৫০০ টাকা মুচলেকায় তাদের জামিন মঞ্জুর করেন।২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শাযরেহ হক বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে গত ১১ জানুয়ারি পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে সিমিন রহমানসহ ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

মামলার অভিযোগ পত্রে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ১৩ জুন ঢাকায় বোর্ড মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। সেই মিটিংয়ের এজেন্ডা হিসেবে ছিল পূর্বের মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুমোদন; ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মিটিংয়ে অংশগ্রহণ ও ইলেকট্রনিক সিগনেচারের অনুমোদন; লতিফুর রহমান কর্তৃক শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়ে অনুমোদন। এই মিটিংয়ে হাজিরা শিটে লতিফুর রহমানকে ছুটিতে দেখানো হয়েছে। হাজিরা শিটে আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের স্বাক্ষর থাকলেও মিটিংয়ের সময় তিনি কুমিল্লায় অবস্থান করেন।

এই বোর্ড মিটিংয়ে তৃতীয় এজেন্ডার মাধ্যমে লতিফুর রহমানের ২৩ হাজার ৬০০ শেয়ারের মধ্যে তার বড় মেয়ে সিমিন রহমানকে ১৪ হাজার ১৬০টি, ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমান ও ছোট মেয়ে শাযরেহ হককে চার হাজার ৭২০টি শেয়ারসহ সর্বমোট ২৩ হাজার ৬০০টি শেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছে। এই মিটিংয়ের বিষয়ে শাযরেহ হক দাবি করেন, এই ধরনের বোর্ড মিটিং ২০২০ সালের ১৩ জুন অনুষ্ঠিত হয়নি। তদন্তকালে কম্পানির বর্তমান পরিচালককে ওই তারিখের বোর্ড মিটিং ও রেগুলেশনের কাগজপত্র উপস্থাপনের জন্য বলা হলে আসামিপক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া তদন্তে বোর্ড মিটিংয়ের আগে কোনো ই-মেইল অথবা ডাকযোগে কোনো নোটিশ বা চিঠির কপি পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া আরজেএসসিতে (যৌথ মূলধনী কম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর) জমাকৃত শেয়ার হস্তান্তরে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন সিমিন রহমান।

অভিযোগ পত্রে আরো বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ১৩ জুন ট্রান্সকম লিমিটেডের শেয়ার হস্তান্তরের কাগজপত্র আরজেএসসিতে জমা দেওয়া হয়।ওই বছরের ১৭ আগস্ট শেয়ার হস্থান্তর হলেও আরজেএসসি নিয়ম অনুযায়ী শেয়ার হস্থান্তরের ফি পরিশোধ না করে বিলম্বে একই বছরের ২ সেপ্টেম্বর শেয়ার হস্তান্তরের ফি পরিশোধ করা হয়েছে। এই শেয়ার হস্তান্তর জমা প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করা হয়েছে। শেয়ার হস্তান্তরের সময় দাতা ও গ্রহীতা কোনো পক্ষই আরজেএসসিতে উপস্থিত ছিলেন না। শেয়ার হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলাকালে শেয়ার গ্রহীতা অর্থাৎ আসামিদের পক্ষে শুধু অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু নিয়ম হচ্ছে, শেয়ার হস্তান্তরের সময় দাতা ও গ্রহীতা উভয় পক্ষকে সশরীরে উপস্থিত থেকে আরজেএসসির প্রতিনিধির সম্মুখে উভয় পক্ষকে স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু শেয়ার হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় এই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি, যা ১৯৯৪ সালের কম্পানি আইনের ৩৮ ধারার লঙ্ঘন।

এ ছাড়া ২০২০ সালে ভাই-বোনের ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে বেশির ভাগ শেয়ার নিজের নামে নেওয়ার জন্য সিমিন গ্রুপ অব কম্পানির নথিপত্র ও পারিবারিক ডিড অব সেটলমেন্ট তৈরি করেন। এ জন্য সিমিন রহমান দুটি ভুয়া স্ট্যাম্প এফিডেভিট ব্যবহার করে সেখানে ছোট বোন শাযরেহ হকসহ বাবা, ভাই ও অন্যদের স্ক্যান করা স্বাক্ষর ব্যবহার করে ট্রান্সকমের বেশির ভাগ শেয়ার ট্রান্সফারের দলিল তৈরি করেন এবং এগুলো আরজেএসসিতে দাখিল করেন সিমিন। শাযরেহ হকের নামে আরজেএসসিতে সিমিনের করা এফিডেভিটের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ২০২৩ সালে সৃজনকৃত বলে সম্প্রতি ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে দেওয়া ডাক বিভাগ ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের অফিসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

চার্জশিটে আরো বলা হয়, জাল সন্দেহ হওয়ায় দুটি স্ট্যাম্পের সত্যতা নিয়ে ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে একটি প্রতিবেদন চান আদালত। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, যে ভেন্ডর থেকে এই স্ট্যাম্প দুটি সরবরাহের তথ্য রয়েছে, ওই ভেন্ডরের লাইসেন্স ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর বাতিল করা হয়।

তিনি ২০২৩ সালের স্ট্যাম্পকে অসদুপায়ে সংগ্রহ করে আসামিপক্ষকে ২০২০ সালের ৩ মার্চ নিজ স্বাক্ষরে সরবরাহ করেন।

এমআর/টিএ 

Share this news on:

সর্বশেষ

img
সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের চাচা আর নেই Jan 21, 2026
চাকসুর গত ৯০ দিনের কার্যক্রম তুলে ধরলেন জিএস | Jan 21, 2026
img
ঢাকা থেকে জামায়াত আমিরের নির্বাচনী সফর শুরু: মাঠে বাংলাদেশ টাইমসের তিন মোজো Jan 21, 2026
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে তারেক রহমান Jan 21, 2026
চাকসুর গত ৯০ দিনের কার্যক্রম তুলে ধরলেন জিএস Jan 21, 2026
'মিডিয়ার মধ্যে কি ক্যু হয়ে গিয়েছে নাকি Jan 21, 2026
ট্রাম্পের ‘গোপন নির্দেশনা’, কী ঘটতে যাচ্ছে তেহরানে Jan 21, 2026
img
শুটিংয়ে আচমকা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ‘বাহামণি’ রণিতা Jan 21, 2026
img
এবার ১০ দলীয় জোট সরকার গঠন করবে : ডা. তাহের Jan 21, 2026
গয়না ও অ্যাকসেসরিতে ফুটেছে আভিজাত্যের ছোঁয়া Jan 21, 2026
বন্ধু ও পরিবারকে নিয়ে আনন্দময় মুহূর্ত Jan 21, 2026
img
বাংলাদেশ ভারতে না খেললে বিকল্প দলকে বিশ্বকাপে সুযোগ দেবে আইসিসি Jan 21, 2026
শাহরুখ-হান্দে বিতর্কের আসল রহস্য Jan 21, 2026
img
আমরা নিরাপত্তা সংকটে আছি : নুরুল হক নুর Jan 21, 2026
img
রামগোপালের দাবি, এ আর রহমানের ‘জয় হো’ গান আসলে সুখবিন্দরের তৈরি! Jan 21, 2026
img
গুম শুধু ভুক্তভোগীকেই নয়, পুরো সমাজকে শাস্তি দেয়: চিফ প্রসিকিউটর Jan 21, 2026
img
নির্বাচনকে সামনে রেখে পরীক্ষা শুরু হলো, ১২ ফেব্রুয়ারি ফাইনাল: প্রধান উপদেষ্টা Jan 21, 2026
img
সিনেমা ছেড়ে নতুন পথে বলিউড স্টার রিমি সেন Jan 21, 2026
img
গণভোটকে নয়, জাতীয় পার্টিকেই ‘না’ বলবে জনগণ : আখতার Jan 21, 2026
img
জাতীয় দলে রোনালদোর ভূমিকা নিয়ে মুখ খুললেন পর্তুগাল কোচ Jan 21, 2026