গুম শুধু ভুক্তভোগীকেই নয়, পুরো সমাজকে শাস্তি দেয়: চিফ প্রসিকিউটর

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘গুমের অপরাধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এটি শুধু ভুক্তভোগীকেই নয়, পুরো সমাজকেই শাস্তি দেয়। একজন মানুষ গুম হলে তার পরিবার প্রতিদিন বিচারহীনতার কারাগারে বন্দি থাকে।’

আওয়ামী লীগের শাসনামলে টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই সেল) গুম করে নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বুধবার (২১ জানুয়ারি) সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর আগে সূচনা বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ চিফ প্রসিকিউটর আজ সূচনা বক্তব্য পেশ করেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা গুমের যে মামলার বিচার শুরু করছি, সেগুলো কেবল কিছু ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ছিল না। এগুলো ছিল নির্মম আওয়ামী ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রীয় শাসনপদ্ধতির কৌশলের সাক্ষ্য। যে কৌশল স্রেফ গোপনে হত্যা করে লাশ গোপনই করেনি, বরং জ্যান্ত লাশ বানিয়ে অক্ষম করে রেখেছিল বিরোধী মতের হাজার হাজার মানুষকে।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ বলেন, ‘নীরব ও আলো-বাতাসহীন অন্ধকার কুঠরিতে হাত-পা বেঁধে মাসের পর মাস বিনা বিচারে বন্দিদের আটকে রাখার এই কৌশল, সমাজে ভয়, অনিশ্চয়তা ও একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছিল।

এই ক্ষত কেবল রাজনৈতিক জনপরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং জনগণের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসমূহ বিদ্যমান ছিল, সেই বাহিনীগুলোর কাঠামোর মধ্যেও গভীরভাবে প্রবেশ করেছিল।’

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম আরো বলেন, ‘বিরোধী চিন্তার মানুষদের গুম করে তিলে তিলে অক্ষম করে দেওয়ার মাধ্যমে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকল্পের যে উগ্র বাসনা বাস্তবায়িত হয়েছে, তার পথে দেশের প্রধান কয়েকটি নিরাপত্তা বাহিনীর একদল সদস্য মার্সেনারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল, আর এর ফলে খোদ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যেই যে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা নজিরবিহীন।’ 

তিনি বলেন, ‘মানুষ হিসেবে মানুষের যে ন্যূনতম মর্যাদা থাকে, বলপূর্বক গুম সেই মর্যাদাকে সম্পূর্ণভাবে নিঃশেষ করে দেয়। এ কারণেই আন্তর্জাতিক আইনে বলপূর্বক গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, কারণ এটি একযোগে বহু অধিকার ধ্বংস করে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আরো বলেন, হাসিনার রাষ্ট্রকল্পে গুমের কৌশল মানুষকে কেবল দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেয়নি; অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর নির্যাতনের মাধ্যমে দেহকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু বা চিরতরে অক্ষম করে দিয়েছে। 

তিনি বলেন, এখানে মৃত্যু ঘটানো হয় না প্রকাশ্যে; বরং মানুষকে ঝুলিয়ে রাখা হয় জীবিত ও মৃতের মাঝখানে। পরিবার জানে না সে বেঁচে আছে কি না। 
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম আরো বলেন, ‘এই অপরাধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এটি শুধু ভুক্তভোগীকেই নয়, পুরো সমাজকে শাস্তি দেয়।’

তিনি বলেন, ‘একজন মানুষ গুম হলে, তার পরিবার প্রতিদিন বিচারহীনতার কারাগারে বন্দি থাকে।

মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন এমনকি প্রতিবেশীরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকতে শেখে, আর এই অনিশ্চয়তাই গুমের রাজনৈতিক কার্যকারিতা।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘এটি ভয় উৎপাদন করে, নীরবতা সৃষ্টি করে ও প্রতিরোধকে ভেঙে দেয়, আর এর মধ্য দিয়েই টিকে থাকে ফ্যাসিবাদী শাসন।’
তিনি আরো বলেন, ‘হাসিনার আওয়ামী জাতিবাদী রাষ্ট্রকল্পে গুমের উদ্দেশ্য শুধু লাশ লুকানো ছিল না, বরং ভয় উৎপাদন আর ফ্যাসিবাদ দীর্ঘকরণের এক ষড়যন্ত্র।’

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় মার্সেনারি যখন কাউকে হত্যা করে, তখন একটি লাশ থাকে। লাশ মানে সাক্ষ্য, জানাজা, কবর, স্মৃতি। কিন্তু যখন কাউকে গুম করা হয়, তখন লাশ থাকে না, সাক্ষ্য থাকে না, কবর থাকে না, থাকে শুধু প্রশ্ন, আর এই প্রশ্নগুলোই ভুক্তভোগী ভুক্তভোগীদের পরিবার জানতে চায় দিনের পর দিন, এমনকি বছরের পর বছর। সে কি বেঁচে আছে?

কোথায় আছে? ফিরবে কি না? বন্দিদের স্ত্রীদের প্রশ্ন ছিল, আমি কি সধবা নাকি বিধবা?’

চিফ প্রসিকিউটর আরো বলেন, ‘বলপূর্বক গুমের নির্মম ইতিহাসে এই আদালত একা নয়। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা বহু আগেই দেখেছে, গুম কিভাবে রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেয়।’

তিনি বলেন, “আর্জেন্টিনার সামরিক শাসনে, চিলির পিনোশে শাসনে, লাতিন আমেরিকার ‘ডার্টি ওয়ার’-এ, বলপূর্বক গুম ছিল প্রধান দমননীতির হাতিয়ার। সেই সব দেশ পরে স্বীকার করেছে যে গুম শুধু ভুক্তভোগীকে ধ্বংস করে না, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকেও দুর্বল করে দেয়। কারণ যে বাহিনী আইনের বাইরে কাজ করতে শেখে, সে বাহিনী শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের জন্যও অনিরাপদ হয়ে ওঠে।”

প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এই ট্রাইব্যুনাল যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেন, তাহলে রাষ্ট্র শিখবে যে তার নাগরিকদের কোনো অবস্থাতেই গুম করা যায় না।’ 

তিনি বলেন, ‘আজ এই আদালতে আমরা শুধু নিখোঁজ ব্যক্তিদেরই খুঁজছি না, কিংবা গুম হয়ে থাকা ব্যক্তিদের যারা জীবিত ফিরে এসেছেন, তাদের জন্য সান্তনা খুঁজছি না। আমরা খুঁজছি মানবিকতার সীমারেখা, অপরাধগুলোর কারণে যেটি বারংবার লংঘিত হয়েছে এই।’ 

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা খুঁজছি জবাবদিহিতা ও  দায়বদ্ধতার সেই দৃষ্টান্ত, যার ফলে এই বাংলাদেশে গুমের মত ঘৃণ্য অপরাধ যেন আর কোনো দিনও মাথা তুলতে না পারে।’

সূত্র : বিএসএস

আরআই/টিএ

Share this news on:

সর্বশেষ

img
নির্বাচন কমিশনের সম্মতিতে ৮ উপজেলার ইউএনও বদল Jan 21, 2026
img
নির্বাচনে বিঘ্ন ঘটাতে দেব না: আলী ইমাম মজুমদার Jan 21, 2026
img
হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে ৭৭ টন চাল আমদানি Jan 21, 2026
img
যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরলেন অভিনেতা অপূর্ব Jan 21, 2026
img
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন পেশ Jan 21, 2026
img
সিলেটের পথে তারেক রহমান Jan 21, 2026
img
ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস নিয়ে বিতর্কের কারণ কী? Jan 21, 2026
img
অবসরে গেলেন ৬০৮ দিন মহাকাশে কাটানো সুনীতা উইলিয়ামস Jan 21, 2026
img
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশ Jan 21, 2026
img
পৃথিবীতে যত ব্যবসা রয়েছে তার মধ্যে শিক্ষা একটা বড় ব্যবসা: রাবি উপাচার্য Jan 21, 2026
img
রাতে শাহজালাল ও শাহপরানের মাজার জিয়ারত করবেন তারেক রহমান Jan 21, 2026
img
তারেক রহমান নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে: খালিদুজ্জমান Jan 21, 2026
img
নির্বাচন নিয়ে সেনাপ্রধানের নতুন বার্তা Jan 21, 2026
img
ইলিয়াস জাভেদ হচ্ছেন স্টারদের স্টার: ওমর সানী Jan 21, 2026
img
অন্যের সঙ্গে সালমানের ঘনিষ্ঠতায় কীভাবে স্বাভাবিক থাকেন দিশা? Jan 21, 2026
img
বাবা হিরণের দ্বিতীয় বিবাহ নিয়ে মুখ খুললেন মেয়ে নিয়াসা Jan 21, 2026
img
আসন্ন নির্বাচনেই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হবে: ডা. তাহের Jan 21, 2026
img
তারেক রহমানের পরিকল্পনা দেশের অর্থনীতি বদলে দেবে: আসলাম চৌধুরী Jan 21, 2026
img
তারেক রহমানের সঙ্গে ৭ দলের বৈঠক Jan 21, 2026
img
রমজানের আগেই এলপিজি সংকট কেটে যাবে: জ্বালানি উপদেষ্টা Jan 21, 2026