চীনের সম্পর্ক ঠিক করতে বেইজিং সফরে যাচ্ছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

বাণিজ্যিক সম্পর্কে টানাপোড়েন সত্ত্বেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের লক্ষ্য নিয়ে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) গভীর রাতে চীন সফরে যাচ্ছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ২০১৮ সালের পর এই প্রথম যুক্তরাজ্যের কোনো প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিক সফরে চীন যাচ্ছেন।

স্টারমারের এই সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, ইউক্রেন যুদ্ধ ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগসহ বিভিন্ন উদ্বেগের বিষয় উঠে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চীন সফর শেষে শনিবার (৩১ জানুয়ারি) স্টারমার জাপানে যাবেন বলে নিশ্চিত করেছে টোকিওর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেখানে তিনি স্বল্প সময়ের জন্য অবস্থান করবেন।

সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সাংবাদিকদের স্টারমারের মুখপাত্র জানান, তিনি মঙ্গলবার রাতেই চীন ও জাপান সফরের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। তবে বহুল আলোচিত এই সফর নিয়ে বিস্তারিত আর কিছু জানানো হয়নি।

মুখপাত্র আরও বলেন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ নানা বিষয় আলোচনায় আসবে; যদিও বিষয়গুলো এতে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি চাপে রয়েছে এবং আগের কনজারভেটিভ সরকারের সময় লন্ডন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল। বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক গতি ফেরানোর লক্ষ্য রয়েছে স্টারমারের।

তার সফর ঘোষণার এক সপ্তাহেরও কম সময় আগে ব্রিটিশ সরকার লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে একটি বিতর্কিত ‘মেগা দূতাবাস’ নির্মাণের পরিকল্পনা অনুমোদন দেয়। প্রায় ২০ হাজার বর্গমিটার (২ লাখ ৩৫ হাজার বর্গফুট) জায়গাজুড়ে এই স্থাপনাটি যুক্তরাজ্যে আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় দূতাবাস কমপ্লেক্স হতে যাচ্ছে ও কোনো পশ্চিমা রাজধানীর কেন্দ্রে অন্যতম বৃহৎ দূতাবাস হিসেবে বিবেচিত হবে।

তবে এই প্রকল্পটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে এবং স্থানীয় ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা গত সপ্তাহে এ নিয়ে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে, স্টারমার নিজেই গত মাসে স্বীকার করেন, চীন একদিকে যুক্তরাজ্যের জন্য বড় অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করলেও অন্যদিকে ‘বাস্তব জাতীয় নিরাপত্তা হুমকিও’ সৃষ্টি করে।

ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘বিভিন্ন ব্যবস্থা’ তৈরিতে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি বেইজিং লন্ডনে তাদের বর্তমান সাতটি স্থাপনা একত্র করে একটি স্থানে আনতে সম্মত হয়েছে, যা ‘নিরাপত্তার দিক থেকে স্পষ্ট সুবিধা’ বয়ে আনবে।

২০২০ সালে হংকংয়ে কঠোর জাতীয় নিরাপত্তা আইন জারির পর যুক্তরাজ্য ও চীনের সম্পর্ক মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটে। ওই আইনের ফলে সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশ হংকংয়ে নাগরিক স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়।

স্টারমার সফরে হংকংয়ের গণমাধ্যম উদ্যোক্তা ও গণতন্ত্রপন্থি জিমি লাইয়ের বিষয়টিও তুলতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ৭৮ বছর বয়সী লাই ডিসেম্বর মাসে ‘রাষ্ট্রদ্রোহমূলক যোগসাজশের’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন এবং বহু বছরের কারাদণ্ডের মুখোমুখি।

স্টারমারের এই সফর এসেছে গত বছর অর্থমন্ত্রী র‍্যাচেল রিভসের বেইজিং সফরের ধারাবাহিকতায়। মধ্য-বামপন্থি লেবার সরকার বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়ন ও যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোকে তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখছে।

তবে এই ‘রিসেট’ উদ্যোগ দেশীয় রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে হংকং ও মানবাধিকার ইস্যুতে চীনের সমালোচনা করায় যেসব ব্রিটিশ আইনপ্রণেতার ওপর চীন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তারা সরকারের এই অবস্থানের বিরোধিতা করছেন।

কিংস কলেজ লন্ডনের লাউ চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক কেরি ব্রাউন ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, স্টারমার যে সমালোচনার মুখে পড়ছেন, তার বিনিময়ে ‘কিছু না কিছু পাওয়াই যুক্তিযুক্ত’।

তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য সরকারের এখন দেখানোর সময় এসেছে যে, চীনের সঙ্গে বাস্তববাদী সম্পর্ক গড়ার অর্থ হলো এমন ফল পাওয়া, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে ও যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি উন্নয়নের প্রধান লক্ষ্যকে সহায়তা করে।

ব্রাউন আরও বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও অনিশ্চিত আচরণের কারণে নতুন বৈশ্বিক ভূরাজনীতির যে রূপরেখা তৈরি হচ্ছে, তা বোঝার জন্যও এটি একটি ‘চমৎকার সুযোগ’।

তার ভাষায়, হঠাৎ করেই আমাদের প্রচলিত জোট ও মৈত্রী কাঠামো নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। তিনি যোগ করেন, এই প্রেক্ষাপটে চীন হয়তো মিত্র নয়, কিন্তু শত্রুও নয়। অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য দেশের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের আচরণে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হওয়ার যৌক্তিক কারণ চীনেরও রয়েছে।

সূত্র: এএফপি

এমআর/টিএ 

Share this news on:

সর্বশেষ

img
‘মিডল ক্লাস ফ্যামিলি’ নিয়ে আসছেন নিশাত প্রিয়ম Jan 27, 2026
img
সকালে খালি পেটে যে ৭ অভ্যাস শরীরের ক্ষতির কারণ Jan 27, 2026
img
চট্টগ্রামে বিএনপি প্রার্থীর প্রচারণায় ককটেল হামলার অভিযোগ Jan 27, 2026
img
গ্রিসে বিস্কুট কারখানায় আগুন, নিহত ৫ Jan 27, 2026
img
সাবেক মন্ত্রী ম খা আলমগীরসহ ১৩ জনের নামে ইইউবির মামলা Jan 27, 2026
img
এ আর রহমানের ধর্মীয় বিভাজন বিতর্কে এবার মুখ খুললেন ওয়াহিদা রহমান Jan 27, 2026
img
গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে প্রচারণার নির্দেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের Jan 27, 2026
img
ভারি খাবারের পর মিষ্টি নাকি টকদই-কোনটি ভালো? Jan 27, 2026
img
ইউরোপীয় কমিশনের তদন্তের মুখে ইলন মাস্কের ‘গ্রোক’ Jan 27, 2026
img
আগামী ৩০ জানুয়ারি নোয়াখালীতে যাচ্ছেন জামায়াতের আমির Jan 27, 2026
img
সুতা আমদানিতে অসম সুবিধা বন্ধে সরকারের হস্তক্ষেপ চায় বিটিএমএ Jan 27, 2026
img
২৭ জানুয়ারি: ইতিহাসে এই দিনে আলোচিত কী ঘটেছিল Jan 27, 2026
১০ মিনিটে গোটা বিশ্বের সারাদিনের সর্বশেষ আলোচিত সব খবর Jan 27, 2026
নেদারল্যান্ডসে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ বিশ্বকাপ বয়কটের দাবিতে পিটিশন Jan 27, 2026
বনগাঁয় পারফর্ম করতে গিয়ে ভক্তদের লা/ঞ্ছ/না! Jan 27, 2026
img
২০ বছর পর আজ গাজীপুরে যাচ্ছেন তারেক রহমান Jan 27, 2026
img
ক্যানসার প্রতিরোধ সম্ভব: প্রাথমিক লক্ষণ চিনলে বাঁচতে পারে জীবন Jan 27, 2026
img
চীনের সম্পর্ক ঠিক করতে বেইজিং সফরে যাচ্ছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী Jan 27, 2026
img
খণ্ডকালীন কাজের অধিকার সীমিত করতে চায় জার্মানি Jan 27, 2026
img
আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করার আহ্বান ইতালির Jan 27, 2026