ভারত-ইইউ ‘মহাচুক্তি’

২৭ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে যুক্ত হচ্ছে ২০০ কোটি মানুষ

ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যে চুক্তিকে দুপক্ষই ‘মহাচুক্তি’ (মাদার অব অল ডিলস) হিসেবে অভিহিত করেছে।

মঙ্গলবার ঘোষিত এই চুক্তিটি প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ ও ধারাবাহিক আলোচনার ফল। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ভূ-অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই এই ঐকমত্যে পৌঁছাল দুই পক্ষ।

ভারত ও ২৭ জাতির এই ইইউ জোটের মধ্যকার চুক্তিটি প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বাজারকে যুক্ত করেছে। এটি বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২৫ শতাংশ এবং যার সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা সোমবার নয়া দিল্লিতে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে সম্মানিত অতিথি হিসেবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে যোগ দেন।

ভারত-ইইউ সম্মেলনের আগে মঙ্গলবার ভার্চ্যুয়ালি এক জ্বালানি সম্মেলনে মোদি বলেন, “এই চুক্তি ভারত ও ইউরোপের মানুষের জন্য বিশাল সুযোগ বয়ে আনবে।”

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে উরসুলা ফন ডার লিয়েন লিখেছেন, “ইউরোপ ও ভারত আজ ইতিহাস গড়ছে। আমরা ২০০ কোটি মানুষের একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি করেছি, যা উভয় পক্ষকেই লাভবান করবে। আমরা আমাদের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে তুলব।”

এই চুক্তির ফলে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে বিদ্যমান শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কিন্তু কী আছে এই চুক্তিতে? আর ট্রাম্পই বা একে কীভাবে নেবেন? রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা অব্যাহত রাখায় গত বছর ভারতের ওপর শাস্তিস্বরূপ ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন তিনি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর ইইউ-ভারত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব চুক্তিতে সই করছেন; ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬।

এই চুক্তির আওতা কতটুকু এবং এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ইইউয়ের কাস্টমস ইউনিয়নের পণ্য, সেবা ও বিনিয়োগ—সবই এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। এটি ভারতের এ যাবৎকালের বৃহত্তম ও সবচেয়ে বিস্তৃত বাণিজ্যিক চুক্তি।

২০২৩ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ভারতের জন্য তাদের জেনারেলাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্স (জিএসপি) সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়, যার ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা উচ্চ শুল্কের মুখে পড়েন। বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন এই চুক্তির ফলে বস্ত্র, ওষুধ, যন্ত্রপাতি, ইস্পাত, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের মতো বেশ কিছু খাতে ভারত বিশেষ সুবিধা পেতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ১৪৪টি উপ-খাতে ভারতকে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে। বিপরীতে ভারতও ইইউ-এর জন্য তাদের আর্থিক সেবা, সমুদ্রবন্দর এবং টেলিযোগাযোগসহ ১০২টি উপ-খাত উন্মুক্ত করে দিচ্ছে।

মঙ্গলবার মোদি বস্ত্র, রত্ন ও অলঙ্কার শিল্পের শ্রমিক এবং ব্যবসায়িক নেতাদের উদ্দেশে বলেন, “এই চুক্তি আপনাদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক বলে প্রমাণিত হবে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, এটি কেবল ভারতের উৎপাদন খাতকেই চাঙ্গা করবে না, বরং সেবা খাতেরও প্রসার ঘটাবে।

নরেন্দ্র মোদি বলেন, “এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বিশ্বের প্রতিটি ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীর কাছে ভারতের প্রতি আস্থা আরও সুদৃঢ় করবে। ভারত সব খাতেই বৈশ্বিক অংশীদারত্বের ওপর ব্যাপকভাবে কাজ করছে।”

একাধিক বাণিজ্য আলোচনায় যুক্ত থাকা অর্থনীতিবিদ বিশ্বজিৎ ধর বলেন, চুক্তির চূড়ান্ত খসড়াটি এখনো ব্রাসেলস ও নয়াদিল্লিতে আইনি পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এটি আগামী বছরের আগে কার্যকর না-ও হতে পারে।

আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটগুলো নিয়ে অভিজ্ঞ সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়েত এই চুক্তিকে ‘চমৎকার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সামলে পেশাদার উপায়ে বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দেবে।”

অনিল ত্রিগুনায়েত বলেন, “২০ বছর আগের তুলনায় বর্তমান ভারতের ইউরোপীয়দের সঙ্গে মিলে কাজ করার সক্ষমতা রয়েছে এবং ভারত তাদের জন্য একটি বড় বাজার। সস্তা ওয়াইন কিংবা বিএমডব্লিউ ছাড়াও এই চুক্তিতে বাণিজ্য বিনিয়োগসহ আরও অনেক কিছু দেখার আছে।”


বিশ্বজিৎ ধর আল জাজিরাকে বলেন, “ভারত ও ইইউ—উভয় পক্ষের জন্যই এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তি। এটি ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই চুক্তি উভয় পক্ষের জন্যই একটি বড় সুযোগ। এর মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজেদের বাজারকে আরও বহুমুখী করার সুযোগ পাবে।

মুম্বাইয়ের শোরুমে বিক্রির জন্য রাখা জার্মানিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বিএমডব্লিউর গাড়ি। বর্তমানে এসব গাড়ির ওপর ভারতে উচ্চহারে শুল্ক বিদ্যমান রয়েছে, তবে নতুন বাণিজ্য চুক্তির আওতায় এই শুল্ক নাটকীয়ভাবে কমে আসবে।

ভারত কি তবে তাদের অতি-সুরক্ষিত অটোমোবাইল খাত উন্মুক্ত করছে?
অটোমোবাইল খাতে সংরক্ষণবাদী নীতির জন্য অতীতে বেশ সমালোচনার মুখে পড়েছে ভারত। এমনকি টেসলার মালিক ইলন মাস্কও এ নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। বিদেশি গাড়ির ওপর ভারত বরাবরই ১১০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করে আসছিল।

২০১৩ সালে ভারত ও ইইউ-এর মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল এই অটোমোবাইল খাত উন্মুক্ত করতে নয়াদিল্লির অনীহা।

তবে মঙ্গলবার ঘোষিত চুক্তি অনুযায়ী, নয়াদিল্লি এখন তাদের অভ্যন্তরীণ গাড়ির বাজার ইইউ দেশগুলোর জন্য উন্মুক্ত করে দেবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আমদানিকৃত বেশিরভাগ গাড়ির শুল্ক কমিয়ে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। পরবর্তীতে কয়েক বছরের মধ্যে এই শুল্ক ধাপে ধাপে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

জানা গেছে, ১৫ হাজার ইউরোর (১৭ হাজার ৮০০ ডলার) কম দামি ইউরোপীয় গাড়িগুলো এই চুক্তির বাইরে থাকছে এবং এগুলোর ওপর আগের মতোই উচ্চ শুল্ক বহাল থাকবে। এর চেয়ে বেশি দামি গাড়িগুলোকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হবে, যেগুলোর জন্য আলাদা কোটা ও শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতে প্রথম পাঁচ বছর ইইউ থেকে আসা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর আমদানি শুল্ক কমানো হবে না।

পরবর্তীতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার জ্বালানিচালিত ইঞ্জিন এবং ৯০ হাজার বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে।

এসব সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও, বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণার পর ভারতের গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।

২৬ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে নয়াদিল্লিতে প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে উপস্থিত ছিলেন মোদি, ফন ডার লিয়েন এবং ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং।

এই চুক্তিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কীভাবে লাভবান হবে?
ইইউ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ৩০ শতাংশের ওপর থেকে ভারত তাৎক্ষণিকভাবে শুল্ক প্রত্যাহার করে নেবে।

ইইউ কর্মকর্তাদের মতে, ভারতে রপ্তানি করা ইউরোপীয় পণ্যের ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশের ওপর থেকে শুল্ক হয় পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে অথবা কমিয়ে আনা হবে। এর ফলে ইউরোপীয় পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ইউরো (৪৭৪ কোটি ডলার) শুল্ক সাশ্রয় হবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে গাড়ি আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও বড় সুবিধা দিচ্ছে ভারত। বর্তমানে যন্ত্রপাতির ওপর ৪৪ শতাংশ, রাসায়নিক পণ্যের ওপর ২২ শতাংশ এবং ওষুধের ওপর ১১ শতাংশ পর্যন্ত যে শুল্ক রয়েছে, তার প্রায় পুরোটাই বিলুপ্ত করা হবে।

এছাড়া ইউরোপীয় উড়োজাহাজ ও মহাকাশযান সংশ্লিষ্ট প্রায় সব পণ্যের ওপর থেকেও শুল্ক তুলে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অপটিক্যাল, মেডিকেল ও সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতির ৯০ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে আর কোনো শুল্ক থাকবে না।

অন্যদিকে, ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত স্পিরিট ও ওয়াইনের ওপর বর্তমানে ১৫০ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। নতুন চুক্তিতে ওয়াইনের শুল্ক কমিয়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ, স্পিরিটের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ এবং বিয়ারের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভারত আর্থিক ও সামুদ্রিক পরিষেবা খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত সংস্থাগুলোকে আরও সহজ সুযোগ দেবে। পাশাপাশি উভয় পক্ষই কাস্টমস বা শুল্ক সংক্রান্ত নিয়মগুলো সহজ করতে এবং মেধা সম্পদের সুরক্ষা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে।

এই চুক্তিতে ভারত কীভাবে লাভবান হবে?
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের ৯০ শতাংশ পণ্যের ওপর থেকে সব ধরনের শুল্ক তুলে নেবে। আগামী সাত বছরের মধ্যে এই সুবিধা ভারতের ৯৩ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত হবে।

যেসব পণ্য অবিলম্বে শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—সামুদ্রিক ও মৎস্যজাত পণ্য যেমন চিংড়ি ও হিমায়িত মাছ (বর্তমানে শুল্ক ২৬ শতাংশ পর্যন্ত), রাসায়নিক পণ্য (১২.৮ শতাংশ), প্লাস্টিক ও রাবার (৬.৫ শতাংশ), চামড়া ও পাদুকা (১৭ শতাংশ), বস্ত্র (১২ শতাংশ), তৈরি পোশাক (৪ শতাংশ), সাধারণ ধাতু (১০ শতাংশ) এবং রত্ন ও অলঙ্কার (৪ শতাংশ)।

ভারতের প্রায় ৬ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে আংশিক শুল্ক ছাড় ও কোটা সুবিধা দেওয়া হবে। এর ফলে ভারতের পণ্যের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় শুল্কের হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়াবে মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশে।

সামগ্রিকভাবে, দুই পক্ষের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ পণ্যই কোনো না কোনোভাবে শুল্ক ছাড়ের সুবিধা পাবে।

তবে ভারত এখনো শুল্কমুক্ত ইস্পাত রপ্তানির কোটা বাড়ানোর বিষয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী ১ জুলাই থেকে ইইউ-এর নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে, তাই ৩০ জুনের মধ্যেই এই আলোচনার ফল আসার কথা। বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী, ভারত ইইউ দেশগুলোতে বছরে ১৬ লাখ টন ইস্পাত শুল্কমুক্তভাবে রপ্তানি করতে পারবে। তবে এটি বর্তমানে ভারতের বার্ষিক রপ্তানির তুলনায় মাত্র অর্ধেক।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম) থেকে ভারতকে কোনো ছাড় দেয়নি। এই ব্যবস্থার আওতায় ইস্পাত, সিমেন্ট, সার এবং বিদ্যুতের মতো ‘কার্বন-নিবিড়’ পণ্য—যেগুলো উৎপাদনে প্রচুর জ্বালানির প্রয়োজন হয়—সেগুলোর ওপর ট্যাক্স বা কর আরোপ করা হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত দেশ যেমন নরওয়ে, আইসল্যান্ড, লিচেনস্টাইন এবং সুইজারল্যান্ড কেবল এই কর থেকে অব্যাহতি পায়। কারণ দেশগুলো ইইউ-এর এমিশন ট্রেডিং সিস্টেম বা সংশ্লিষ্ট চুক্তির সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া সুইজারল্যান্ডের মতো যেসব দেশের এমিশন ট্রেডিং সিস্টেম সরাসরি ইইউ-এর সঙ্গে যুক্ত, তারাও এই ছাড় পায়।

অবশ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি অন্য কোনো দেশকে এ ক্ষেত্রে শিথিলতা প্রদর্শন করে, তবে ভারতও এ নিয়ে আলোচনার সুযোগ পাবে।

ভারত-ইইউ বাণিজ্যের বর্তমান অবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন—উভয় পক্ষের জন্যই সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে এখনো নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে গত এক দশকে ভারত ও ইইউ-এর মধ্যে পণ্য বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২০ সালে দুই পক্ষের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে। এর ফলে পণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন ভারতের বৃহত্তম অংশীদারে পরিণত হয়েছে।

বাণিজ্যের ভারসাম্যের দিক থেকেও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে ভারত। ইইউ দেশগুলোতে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ যেখানে ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার, সেখানে আমদানির পরিমাণ ৬ হাজার ৬৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যে ভারতের উদ্বৃত্ত রয়েছে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারেরও বেশি।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ভারতে রপ্তানি হওয়া পণ্যের বড় অংশজুড়ে রয়েছে যন্ত্রপাতি, পরিবহন সরঞ্জাম ও রাসায়নিক পণ্য। অন্যদিকে ভারত মূলত রাসায়নিক, সাধারণ ধাতু, খনিজ পণ্য এবং বস্ত্র রপ্তানি করে থাকে।

উভয় পক্ষই আশা করছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের এই বাণিজ্যের পরিমাণ ২০০ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকবে।

২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারত ও ইইউ-এর সেবা খাতের বাণিজ্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ে ভারতের সেবা রপ্তানি ২২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রপ্তানি প্রায় ১৭ বিলিয়ন থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৪ বিলিয়ন ডলার। দুই পক্ষ মূলত বিজনেস কনসালটেন্সি ও আইটি সেবা খাতে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য করে থাকে।

ভারত এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নবম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ইইউয়ের মোট বাণিজ্যের ২ দশমিক ৪ শতাংশ হয় ভারতের সঙ্গে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যের পরিমাণ ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

ভারত সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে ৯ লাখ ৩১ হাজার ৬০৭ জন ভারতীয় বসবাস করছেন। তবে ভারতে কতজন ইউরোপীয় নাগরিক বসবাস করছেন, তার কোনো তুলনামূলক তথ্য পাওয়া যায়নি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভাষ্যমতে, বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার ইউরোপীয় কোম্পানি ভারতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতের প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোম্পানির উপস্থিতি রয়েছে।


১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ তারিখে ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউসে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা দুই দেশেরই বেশ কয়েকটি ইস্যুতে এই উত্তেজনা বিরাজ করছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির সুসম্পর্ক থাকলেও ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি শুল্ক আরোপের শিকার দেশগুলোর মধ্যে ভারত অন্যতম। বর্তমানে ভারতের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর অর্ধেকই মূলত রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল কেনা অব্যাহত রাখার সাজা। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের দাবি, এই তেলের অর্থ দিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের খরচ জোগাচ্ছে ক্রেমলিন।

অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উত্তেজনাও বাড়ছে। বিশেষ করে ইইউ সদস্য ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড কিনতে ট্রাম্পের জেদ এই উত্তেজনার কেন্দ্রে।

এই মাসে গ্রিনল্যান্ড কিনতে ট্রাম্পের প্রস্তাবের বিরোধিতা করায় ইউরোপের আটটি দেশের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন তিনি, যা আগামী জুনে ২৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। যদিও গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক বারবার সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ভৌগোলিকভাবে উত্তর আমেরিকায় হলেও রাজনৈতিকভাবে ইউরোপের অংশ এই দ্বীপটি বিক্রির জন্য নয়।

গত সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম চলাকালীন ট্রাম্প সেই হুমকি থেকে সরে আসেন এবং জানান যে, তিনি শুল্ক আরোপ করবেন না। এর পরিবর্তে তিনি বলেন, গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে একটি চুক্তির ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

গত বছর স্বাক্ষরিত ইইউ-ইউএস বাণিজ্য চুক্তির অধীনে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক গুনতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই চাপের মুখে প্রতিক্রিয়া হিসেবেই ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার এই বাণিজ্য চুক্তিটি দ্রুত চূড়ান্ত করা হয়েছে।

বিশ্বজিৎ ধর বলেন, “বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা এখন একটি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। তাই নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা আনার জন্য ভারত ও ইইউ—উভয় পক্ষের জন্যই একটি নিশ্চয়তা তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত এবং আগামীকাল সেখানে কী ঘটবে, তা কারও জানা নেই।”

যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে দেখছে এই চুক্তিকে?
হোয়াইট হাউস ইতোমধ্যে এই চুক্তির সমালোচনা করেছে।

নয়াদিল্লির সঙ্গে এই চুক্তির বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর ক্ষোভ ঝেড়েছেন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট। গত রবিবার এবিসি নিউজকে তিনি বলেন, “রাশিয়ার তেল কেনার কারণে আমরা ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছি। আর গত সপ্তাহে কী হলো দেখুন? ইউরোপীয়রা ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সই করল।”

তিনি আরও যোগ করেন, “তারা (ইউরোপীয়রা) আসলে নিজেদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধের অর্থায়ন করছে।”

গত বছর ট্রাম্প বাণিজ্য যুদ্ধ ঘোষণার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্রুত একটি বাণিজ্য চুক্তি সই করলেও নয়াদিল্লি এখনো ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি ভারত বিশ্বের অন্যান্য অংশের সঙ্গেও তাদের বাণিজ্য বহুমুখীকরণের চেষ্টা করছে।

অনিল ত্রিগুনায়েত বলেন, “ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের মোকাবিলায় ভারত ‘কৌশলগত ধৈর্য’ ধারণের নীতি গ্রহণ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এই চুক্তি মূলত সেই প্রক্রিয়ারই অংশ, যা সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলা করতে এবং নতুন অংশীদার খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।”

নয়া দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ পান্ত আল জাজিরাকে বলেন, “দুটি বড় অর্থনৈতিক শক্তির এভাবে এক হওয়া আসলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি সংকেত যে, তারা নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত।”

তিনি আরও বলেন, “ভারত ও ইইউ-এর মধ্যে একটি অসাধারণ ভূ-রাজনৈতিক পুনর্গঠন ঘটছে। ‘ট্রাম্পের প্রভাব’ এই দুই শক্তির এক হওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে এবং ভবিষ্যতে আমরা তাদের মধ্যে আরও কৌশলগত সংশ্লিষ্টতা দেখতে পাব।”

সূত্র : আলজাজিরা।  

Share this news on:

সর্বশেষ

img
অরিজিতের গান আমার ‘প্লে লিস্ট’-এ সবার প্রথমে থাকে: বিরাট Jan 28, 2026
img
নির্বাচন সফল না হলে বৃত্তচক্রে পড়ে দেশ গণতন্ত্রে ফিরতে পারবে না: আলী রীয়াজ Jan 28, 2026
img
প্রধান উপদেষ্টার কাছে অ্যামনেস্টির মহাসচিবের খোলা চিঠি Jan 28, 2026
img
অতীত নিয়ে আমরা আর কামড়াকামড়ি করতে চাই না: জামায়াত আমির Jan 28, 2026
img

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন

ঢাকাসহ তিন জেলায় নামছে ৩৮ প্লাটুন বিজিবি Jan 28, 2026
img
একটি দল ভোটারদের বিকাশ নাম্বার নিচ্ছে, যা নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন: আমিনুল হক Jan 28, 2026
img
অরিজিত নিজেই সিনেমার গান থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ জানালেন Jan 28, 2026
img
মধ্যপ্রাচ্যে ‘বহু দিন’ সামরিক মহড়ার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের Jan 28, 2026
img
জুলাই আন্দোলনকারীরাই একদিন বিশ্বে নেতৃত্ব দেবে : প্রধান উপদেষ্টা Jan 28, 2026
img
ভারতে নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব, এশিয়ার বিভিন্ন বিমানবন্দরে সতর্কতা Jan 28, 2026
img
অবৈধভাবে সচিবালয়ে প্রবেশে আটক ৩ Jan 28, 2026
img
মাইলস্টোনে নয়, বিমানটি সচিবালয়ে পড়া উচিত ছিল : ফাওজুল কবির Jan 28, 2026
img
জয় পেলে কাউকে দুর্নীতি করতে দেব না: কায়সার কামাল Jan 28, 2026
img
পান্তা খেতাম লবণ ছাড়া, তখন খাবারের অভাব ছিল: ডা. এজাজুল ইসলাম Jan 28, 2026
img
আগামীকাল নওগাঁয় যাচ্ছেন তারেক রহমান, চলছে মঞ্চ তৈরির প্রস্তুতি Jan 28, 2026
img
ক্ষমতায় এলে ১ মাসের মধ্যে হাদির হত্যাকারীদের গ্রেফতার করবো: আসিফ মাহমুদ Jan 28, 2026
img
১৮ কোটি মানুষের ১৩ কোটিই আমার ফ্যান: অপু বিশ্বাস Jan 28, 2026
img

ভারতের শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া সাংবাদিকের মন্তব্য

‘আইসিসি মূলত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের দুবাই অফিস’ Jan 28, 2026
img
ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ডিএমপির ১৫৮৬ মামলা Jan 28, 2026
img
স্টেটমেন্ট আউটফিটে নজরকাড়া লুকে অভিনেত্রী মেহজাবীন Jan 28, 2026