ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নবনিযুক্ত সর্বভারতীয় সভাপতি নীতীন নবীনের এক বক্তব্য ঘিরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। দুর্গাপুরে বর্ধমান বিভাগীয় কার্যকর্তা সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি সাহিত্যে নয়, শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।
তার এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় হাসি, বিস্ময় ও ক্ষোভের ঝড়। বুধবারের ওই সভায় নীতীন নবীন বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেশ ও সমাজকে শিক্ষার নতুন পথ দেখিয়েছেন এবং শান্তির জন্য তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
এই বক্তব্যের পরপরই উপস্থিত অনেকেই হতবাক হয়ে পড়েন। কারণ ইতিহাস অনুযায়ী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন- তিনি ছিলেন প্রথম এশীয় নোবেলজয়ী।
এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের পাশাপাশি কংগ্রেস ও সিপিএমও কড়া ভাষায় সমালোচনা করে। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, রবীন্দ্রনাথ শুধু বাঙালির নন, গোটা বিশ্বের গর্ব।
তার নোবেল পুরস্কার নিয়েই যদি দেশের শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিভ্রান্ত থাকেন, তাহলে সেটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তার মতে, এটি বাঙালি সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতি চরম অবজ্ঞারই প্রকাশ।
অন্যদিকে, কংগ্রেস নেতা ও প্রাক্তন প্রদেশ সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী বলেন, বিজেপি বারবার প্রমাণ করেছে তারা ভারতের বহুত্ববাদী ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে উদাসীন। রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্বমানের মনীষীর নোবেল প্রাপ্তির বিষয় নিয়েও যদি ভুল তথ্য মঞ্চ থেকে ছড়ানো হয়, তবে সেটি শুধু অজ্ঞতা নয়, দায়িত্বজ্ঞানহীনতাও।
সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য সুজন চক্রবর্তী আরও কড়া সুরে বলেন, বিজেপি নেতাদের মুখে ইতিহাস বিকৃতির ঘটনা নতুন নয়। তিনি দাবি করেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মানবতাবাদী ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর- যা বিজেপির রাজনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সেই কারণেই তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বা অজ্ঞতাবশত রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করে।
এই বিতর্ক শুধু রাজনৈতিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু শিক্ষক, গবেষক ও সাহিত্যপ্রেমীও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন- যে দলের নেতৃত্ব দেশ চালাতে চায়, তাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা থাকা কি জরুরি নয়?
বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনেও বিষয়টি নজর কেড়েছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু ভারতের নন, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা এবং এই ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক চেতনায় গভীরভাবে জড়িত এক মহান ব্যক্তিত্ব। ফলে তার নোবেল পুরস্কার নিয়ে এমন ভুল বক্তব্য দুই বাংলাতেই আলোড়ন তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বরাবরই ‘বাঙালি অস্মিতা’ নিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা করে আসছে।
কিন্তু শীর্ষ নেতার মুখে এমন বক্তব্য সেই দাবিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বরং এতে আরও একবার প্রমাণ হলো, রাজনৈতিক বক্তৃতায় তথ্য যাচাইয়ের অভাব কতটা বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজেপির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনও সংশোধনী বা দুঃখপ্রকাশ করা হয়নি।
তবে বিরোধীদের দাবি, শুধু সংশোধনী নয়- এই ধরনের বক্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন, তা শুধু ইতিহাসের তথ্য নয়- এটি বাঙালি আত্মপরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এমন মন্তব্য নিঃসন্দেহে দুই বাংলার মানুষকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে- রাজনীতির মঞ্চে ইতিহাস ও সংস্কৃতির দায়িত্ব কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?
এসকে/এসএন