নাকতলার সেই বাড়িতে ঢুকলেই যেন অন্য এক জগৎ খুলে যেত। ঘরের কোণে কোণে বাদ্যযন্ত্র, দেওয়াল জুড়ে এক কিংবদন্তি শিল্পীর স্মৃতি, আর আড্ডার টেবিলে সুরের অনন্ত গল্প। সেই পরিবেশেই বড় হয়ে ওঠা গৌরব চট্টোপাধ্যায়, সবার কাছে যিনি গাবু নামে পরিচিত, আজও বহন করে চলেছেন এক সমৃদ্ধ সঙ্গীত ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। তবু তাঁর কথায় স্পষ্ট, উত্তরাধিকার থাকলেও নিজের পরিচয় গড়ে তোলার লড়াই আলাদা।
একান্ত আলাপচারিতায় গাবু জানালেন, তাঁর বাবা ছিলেন সত্যিই অসাধারণ প্রতিভার মানুষ, কিন্তু তাই বলে নিজেকে তিনি পিছিয়ে রাখতে রাজি নন। ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে নিয়মিত গানবাজনা, বাউলদের আসর, শিল্পীদের আনাগোনা সব মিলিয়ে এক বৌদ্ধিক ও সৃজনশীল পরিবেশেই বড় হয়েছেন তিনি। পরিবারের প্রায় প্রত্যেক সদস্যের হাতেই কোনও না কোনও বাদ্যযন্ত্র থাকত, ফলে সুর যেন ছিল তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
তবে পারিবারিক ধারা কখনও চাপিয়ে দেওয়া হয়নি বলেই দাবি তাঁর। পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়ম করে রেওয়াজ করার পরামর্শ মিলত, বকাঝকাও দুই দিকেই সমান ছিল। এই ভারসাম্যই তাঁকে নিজের মতো করে পথ বেছে নিতে সাহস জুগিয়েছে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন তাঁদের ব্যান্ডের পথচলা শুরু, তখন থেকেই লক্ষ্য ছিল আলাদা পরিচিতি তৈরি করা। সময়ের সঙ্গে সেই চেষ্টাই ধীরে ধীরে ফল দিয়েছে।
পরবর্তী সময়ে দেশ বিদেশের নানা মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশন, ভিন্ন সংস্কৃতির শিল্পীদের সঙ্গে কাজ সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতার ঝুলি ভারী হয়েছে। শিগগিরই প্রকাশ পেতে চলা নতুন অ্যালবাম নিয়েও উচ্ছ্বসিত তিনি। একাধিক ভাষার গান নিয়ে তৈরি সেই কাজের মধ্যে ধরা থাকবে নানা সুরের মেলবন্ধন।
বর্তমান সঙ্গীতজগতের বাস্তবতা নিয়েও অকপট গাবু। তাঁর মতে, নতুন ব্যান্ড বা মৌলিক গান করা শিল্পীদের জন্য পথটা আগের চেয়ে কঠিন হয়েছে। গণমাধ্যমে নির্দিষ্ট ধরনের গানই বেশি জায়গা পাচ্ছে, ফলে নতুনরা সুযোগ কম পাচ্ছেন। তবু তিনি আশাবাদী, লাইভ অনুষ্ঠানের আলাদা এক টান এখনও শ্রোতাদের টেনে রাখে। একই সঙ্গে স্থানীয় শিল্পীদের আরও বেশি মঞ্চ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সঙ্গীতের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে প্রযুক্তির প্রসঙ্গ এড়াননি গাবু। তাঁর বিশ্বাস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভয় নয়, বরং একটি উপকরণ যে যেমন ভাবে ব্যবহার করবে, ফলও তেমনই হবে। সব মিলিয়ে সুর, সংগ্রাম আর স্বপ্নের মিশেলে তাঁর সঙ্গীত সফর আজও এগিয়ে চলেছে নিজের ছন্দে।
সূত্র: আনন্দবাজার
পিআর/টিকে