'পরবর্তী সরকার চাইলে চুক্তি থেকে বের হতে পারবে', যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি নিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা
ছবি: সংগৃহীত
০২:৩০ এএম | ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
বাণিজ্য সচিব বলেন, 'প্রথমে এই চুক্তিতে এনফোর্সমেন্ট ক্লজ ও এক্সিট ক্লজ ছিল না। আমরা এই দুটিকে অন্তর্ভুক্ত করেছি। নোটিফিকেশনের ডেট থেকে এটি কার্যকর হবে। আর যেকোনো পক্ষ দুই মাসের নোটিশ দিয়ে এই চুক্তি থেকে বের হয়ে যেতে পারবে। '
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ (পারস্পরিক শুল্ক) সংক্রান্ত চুক্তিটি স্থায়ী কোনো বাধ্যবাধকতা নয়; পরবর্তী সরকার চাইলে যথাযথ নোটিশ দিয়ে এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। চুক্তিতে এমন সুরক্ষা ধারা (এক্সিট ক্লজ) যুক্ত করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা এসব তথ্য জানান।
গত সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে এই রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির বিস্তারিত ও প্রভাব সম্পর্কে অবহিত করতেই সংবাদ সম্মেলনটি ডাকা হয়। অনুষ্ঠানে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, 'এই চুক্তির মধ্যে একটি শর্ত যুক্ত আছে যে, যদি প্রয়োজন হয় তাহলে উভয় দেশই একটি এপ্রোপ্রিয়াট নোটিশ দিয়ে চুক্তি থেকে বের হয়ে আসতে পারবে। ফলে পরবর্তী সরকার যদি মনে করেন যে কোনো কারণে উনাদের জন্য এই চুক্তি উপযুক্ত নয়, সেটার বিষয়েও আমরা কগনিজেন্স ছিলাম, সেজন্য এই ধরা রাখা হয়েছে।'
চুক্তির মেয়াদ ও কার্যকারিতা প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব জানান, দুই মাসের নোটিশ দিয়ে এই চুক্তি থেকে বের হওয়া সম্ভব। উভয় দেশ নোটিশ ইস্যু করার মাধ্যমে এটি কার্যকর হবে।
এর আগে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র তাদের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর বিভিন্ন হারে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করে। পরবর্তীতে ওই বছরের আগস্টে অনেক দেশের ক্ষেত্রে এই শুল্কহার কিছুটা কমানো হয়। বাণিজ্য ঘাটতির হিসাব বিবেচনা করেই এই হার নির্ধারণ করে মার্কিন প্রশাসন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের পরপরই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে, বাণিজ্য উপদেষ্টা ইউএসটিআর-কে (যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি) এবং বাণিজ্য সচিব সহকারী ইউএসটিআর-কে পৃথক পৃথক চিঠি পাঠিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেন।
দীর্ঘ ৯ মাসের আলোচনার পর সোমবার এই চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়। ১২ জুন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম চুক্তির খসড়া দেয়। এরপর অনলাইন ও সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হয়। শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করলেও আলোচনার পর গত আগস্টে তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। সর্বশেষ চুক্তিতে তা আরও কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
চুক্তির বড় সাফল্য হিসেবে জানানো হয়, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক যদি যুক্তরাষ্ট্রের তুলা থেকে উৎপাদিত কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়, তবে তার ক্ষেত্রে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ হবে শূন্য। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান মেইড ফাইবার থেকে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে কোনো শুল্ক দিতে হবে না।
বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, 'বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ট্রেড সারপ্লাস ডেসটিনেশন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার বাংলাদেশের জন্য অতি সংবেদনশীল ও অতি প্রয়োজনীয়। এই বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার সামগ্রিকভাবে চেষ্টা করেছে।'
তিনি আরও জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি কমিয়ে ভারসাম্য আনতে আমদানি নীতিতে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন ও উদারীকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মূলত কৃষি পণ্য, জ্বালানি পণ্য এবং মেটাল স্ক্র্যাপ (ধাতব বর্জ্য) আমদানি বাড়ানোর মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি নামিয়ে আনা হবে। চুক্তির ফলে ১৯ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া ১০ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বিশালত্বের কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি। ফলে তাদের আমদানি চাহিদাও বিপুল। বাংলাদেশের রপ্তানির অপার সম্ভাবনা তৈরি হবে। বাংলাদেশ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের গম, ভুট্টা, তেলবীজসহ বিভিন্ন ধরনের কৃষি পণ্য আমদানি করে। শেখ হাসিনা যে বুঝিয়ে গেছেন যে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, একথাটি ভুল। আমদানির ক্ষেত্রে আমরা যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, বিশেষ করে কৃষি পণ্য, এগুলো বাংলাদেশকে আমদানি করতে হয়।'
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানান, পোটেনশিয়াল ট্যারিফ অ্যাডজাস্টমেন্ট ফর পার্টনার কান্ট্রিজ' নামক সুবিধার আওতায় যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই চুক্তি করেছে, তারা বিশেষ ট্যারিফ সুবিধা পাবে। এর আওতায় প্রায় ২৫০০ পণ্যের ওপর ডিউটি ফ্রি (শুল্কমুক্ত) সুবিধা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই তালিকায় বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে এক নম্বরে রয়েছে ফার্মাসিউটিক্যালস বা ওষুধ। ফলে সব ধরনের ওষুধ এবং ওষুধের কাঁচামাল শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এছাড়াও প্লাস্টিক পণ্য, এয়ারক্রাফট পার্টস, প্লাইউড, পার্টিকেল বোর্ড, কৃষি পণ্য ও মৎস্য পণ্য এই সুবিধার আওতায় থাকবে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা মনে করেন, এই চুক্তির ফলে দেশের টেক্সটাইল, স্পিনিং ও উইভিং সেক্টর বিশেষভাবে লাভবান হবে। কারণ এখানে 'ডাবল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন' (দুই স্তরের রূপান্তর) ঘটবে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ এফটিএ (মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি) করার চেষ্টা করলেও যুক্তরাষ্ট্র তাতে আগ্রহী ছিল না।
চুক্তিতে কোনো কঠিন শর্ত আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, 'প্রথমে এই চুক্তিতে এনফোর্সমেন্ট ক্লজ ও এক্সিট ক্লজ ছিল না। আমরা এই দুটিকে অন্তর্ভুক্ত করেছি।
নোটিফিকেশনের ডেট থেকে এটি কার্যকর হবে। আর যেকোনো পক্ষ দুই মাসের নোটিশ দিয়ে এই চুক্তি থেকে বের হয়ে যেতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র কবে থেকে কার্যকর করবে সে বিষয়ে বাংলাদেশকে জানাবে। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ নোটিশ জারি করবে। এই নোটিফিকেশন কবে দেওয়া হবে, সেটি সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।'
তৃতীয় কোনো দেশ থেকে আমদানি কমানো বা যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ রাজনৈতিক ইচ্ছা পূরণের কোনো বিষয় চুক্তিতে আছে কি না, এমন প্রশ্নে বাণিজ্য উপদেষ্টা সরাসরি বলেন, 'চুক্তিতে এ ধরনের কিছু নেই।'
সচিব যোগ করেন, 'শুরুর দিকে কিছু বিষয় ছিল। কিন্তু আমরা রাজি হইনি। আমরা নেগোশিয়েশন করে সেগুলো বাদ দিতে সক্ষম হয়েছি। আমরা বলেছি ইমপারসোনাল বা অন্য দেশের প্রতি সেনসিটিভিটি তৈরি করে এমন কিছু আমরা চুক্তিতে রাখতে পারব না।'
টিজে/টিএ