© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

নির্যাতনের রাজনীতি পেরিয়ে প্রথমবারেই মন্ত্রিসভায় নুর

শেয়ার করুন:
নির্যাতনের রাজনীতি পেরিয়ে প্রথমবারেই মন্ত্রিসভায় নুর

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৬:০৫ পিএম | ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
নুরুল হকের রাজনীতি মিছিল থেকে নয়, শুরু হয়েছিল আঘাত থেকে। প্রথমে ধাক্কা, পরে ঘুষি, তারপর মামলা। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ধাপে নির্যাতন ছিল সঙ্গী। 

ফলে আজ প্রতিমন্ত্রী পরিচয়ের আগে নূরের নামের সঙ্গে যেটা জুড়ে গেছে, তা হলো-হামলা, মামলা আর সহ্য করার এক দীর্ঘ ইতিহাস। 

নুরুল হক রাজনীতিতে এসেছিলেন ছাত্র আন্দোলনের হাত ধরে। শুরুটা ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলন; তারপর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন। শেষে গিয়ে ঠেকে এনআরসিবিরোধী সমাবেশে। ছাত্র অধিকার সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত এসব আন্দোলনে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। কিন্তু রাজপথে সামনে থাকা মানেই নিরাপদ থাকা নয়—নুরের ক্ষেত্রে তা ছিল আরো স্পষ্ট।

২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি নির্বাচিত হয়ে দেশব্যাপী পরিচিতি পান নুর। এরপর থেকেই একের পর এক হামলা। কখনো মিছিল শেষে, কখনো ক্যাম্পাসে, কখনো আবার নিজের গ্রামে ঈদের দিন। শরীরের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই নতুন কর্মসূচি, নতুন সংঘর্ষ। সহকর্মীরা বলছেন, একসময় নুরের শরীরের চেয়ে মামলার কাগজের ওজনই বেশি হয়ে উঠেছিল।

নির্যাতনের মাত্রা শুধু রাজপথে থামেনি। গ্রেপ্তার, রিমান্ড, কারাবাস—সবই এসেছে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে। ২০২৪ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে পাঁচ দিনের রিমান্ডে থাকতে হয়েছে। এরপর কারাগার। নুর বলেন, শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে বেশি ছিল অনিশ্চয়তার চাপ। আরো কত মামলা আসবে, আরো কতদিন আটকে থাকতে হবে, তার কোনো হিসাব ছিল না।
সবচেয়ে গুরুতর আঘাত আসে ২০২৫ সালের আগস্টে। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে মারাত্মক আহত হন নুর। অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে দেশে চিকিৎসা সম্ভব হয়নি। নিতে হয় বিদেশে। 

রাজনীতির মাঠে সেই দিনটিকে অনেকেই বলেন, ‘নুরের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায়।’ নির্বাচনী প্রচারণার ফাঁকে ফাঁকে নুর প্রায়ই নিজের দুঃসহ স্মৃতির কথা তুলে ধরতেন। তাঁর মুখে নির্যাতনের বর্ণনা শুনে অনেকেরই গা-শিউরে উঠত।

নুরের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যাও কম নয়। পটুয়াখালী-৩ আসনে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেওয়া হলফনামায় উল্লেখ ছিল ১৫টি মামলা। পরিবারের দাবি, প্রকৃতপক্ষে হামলার ঘটনা আরো বেশি। ছোট ভাইয়ের হিসাব অনুযায়ী, নুর অন্তত ২৮ বার হামলার শিকার হয়েছেন।

এই নির্যাতনের ভেতর দিয়েই তৈরি হয়েছে নুরের রাজনৈতিক পরিচয়। তিনি নিজে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একাধিকবার বলেছেন, ‘আমাকে রাজনীতি শিখিয়েছে ব্যথা।’ যে রাজনীতিতে ক্ষমতার চেয়ে সহ্য করার ক্ষমতা বেশি দরকার, সেটা তিনি শিখেছেন হাসপাতালের বিছানায়, থানার হাজতখানায়, আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে।

এখানেই নুরের রাজনীতির ভিন্নতা। অনেকেই রাজনীতি করেন সংগঠন আর সমীকরণের ভেতর দিয়ে। নুরের রাজনীতি এগিয়েছে আঘাত আর মামলা পেরিয়ে। ফলে তার বক্তব্যেও থাকে ক্ষতের অভিজ্ঞতা, আর তাঁর রাজনীতিতে থাকে ব্যক্তিগত যন্ত্রণা থেকে উঠে আসা একধরনের দৃঢ়তা।

সংসদে পৌঁছেও সেই অতীত পিছু ছাড়েনি নুরের। বরং হামলা-মামলার অভিজ্ঞতাই এখন তার রাজনৈতিক মূলধন। চরাঞ্চলের একজন তরুণ কিভাবে রাষ্ট্রের শক্ত কাঠামোর সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে পারে, নুরের গল্প সেই প্রশ্নের উত্তর।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্যাতন, হামলা ও মামলা—এই তিনটি শব্দই নুরুল হকের রাজনীতির আলাদা পরিচয়পত্র। আর সেই পরিচয় নিয়েই তিনি রাজপথ থেকে পৌঁছে গেছেন সংসদে। সেখান থেকে প্রতিদান হিসেবে পেয়েছে মন্ত্রিত্ব।

উল্লেখ্য, নুরুল হক চার ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে চতুর্থ। নুরের বয়স আড়াই বছর হলে মারা যান তাঁর মা নিলুফা বেগম। বাবা ইদ্রিস হাওলাদার স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শৈশবের শোক ও সীমিত সুযোগ-সুবিধা নুরকে হতাশ করেনি, বরং জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দৃঢ়তা এনে দেয়।

পটুয়াখালীর গলাচিপার চরবিশ্বাসের স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা শেষ করার পর নুর ঢাকার পথে হাঁটেন। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোলাম নবী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।

এক বছরের পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। শিক্ষা জীবনের শুরুতেই তিনি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। 


ইউটি/টিএ

মন্তব্য করুন