ইরানের হামলায় প্রায় ২০০ কোটি ডলারের ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের
ছবি: সংগৃহীত
০১:০৮ পিএম | ০৪ মার্চ, ২০২৬
ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর মাত্র চার দিনেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। রাডার ব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান, নৌঘাঁটি থেকে শুরু করে কূটনৈতিক মিশনসহ বিভিন্ন স্থাপনায় একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটেছে। আর এতেই বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড বলছে, শনিবার ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরুর পর প্রথম চার দিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে আনাদোলু এজেন্সির সংকলিত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দাবি করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতির মধ্যে রয়েছে কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে স্থাপিত যুক্তরাষ্ট্রের এএন/এফপিএস-১৩২ প্রারম্ভিক সতর্কতা রাডার ব্যবস্থা। এর মূল্য প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন তথা ১১০ কোটি মার্কিন ডলার। গত শনিবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানানো হয়েছে। কাতার কর্তৃপক্ষ রাডারটিতে আঘাত ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এছাড়া গত রোববার কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ‘ভুলবশত গুলিবর্ষণে’ তিনটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। এতে ছয়জন ক্রু সদস্য প্রাণে বেঁচে গেলেও বিমানগুলো ধ্বংস হয়। এগুলো প্রতিস্থাপনে আনুমানিক ২৮২ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে।
এর আগে শনিবার পাল্টা হামলার শুরুতেই ইরান বাহরাইনের মানামায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে ভয়াবহ হামলা চালায়। এতে দুটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ টার্মিনাল এবং কয়েকটি বড় ভবন ধ্বংস হয়। উন্মুক্ত উৎসের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্যবস্তু হওয়া স্যাটকম টার্মিনালগুলো ছিল এএন/জিএসসি-৫২বি মডেলের, যার প্রতিটির আনুমানিক মূল্য মোতায়েন ও স্থাপনা ব্যয়সহ প্রায় ২ কোটি ডলার।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-রুয়াইস শিল্পনগরে মোতায়েন থাকা থাড অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবস্থার এএন/টিপিওয়াই-২ রাডার উপাদান ধ্বংসের দাবি করেছে ইরান। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে সেখানে হামলার প্রমাণ মিলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ধ্বংস হওয়া রাডার উপাদানের আনুমানিক মূল্য ৫০ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদের প্রায় ১ দশমিক ৯০২ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে হিসাব করা হয়েছে।
মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত সাতটি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বাহরাইনে পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর, কুয়েতে ক্যাম্প আরিফজান, আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি ও ক্যাম্প বুয়েরিং, ইরাকের এরবিল ঘাঁটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দর এবং কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি।
কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিতে ইরানি হামলার পর বিভিন্ন স্থানে ছাদ ধসে পড়ার ছবি প্রকাশিত হয়েছে। ক্যাম্প আরিফজানেই ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন। কুয়েতের ক্যাম্প বুয়েরিংয়ের ভেতরে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি ড্রোন ঘাঁটির ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে সীমানার ভেতর বিস্ফোরিত হয়।
নিউইয়র্ক টাইমসের যাচাইকৃত ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, শনিবার ও রোববার ইরাকের এরবিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামরিক স্থাপনাগুলোতে বারবার আঘাত হানা হয়। সেখানে ধোঁয়া ও আগুনের শিখা দেখা যায়। রোববার সকালে স্যাটেলাইট চিত্রে ঘাঁটির একটি অংশের চারটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া এবং সোমবার ভোর পর্যন্ত আগুন জ্বলতে থাকার চিত্র ধরা পড়ে।
দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরের রোববারের স্যাটেলাইট ছবিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটি বড় ভবন থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। এটি আনুষ্ঠানিক মার্কিন ঘাঁটি না হলেও মধ্যপ্রাচ্যে নৌবাহিনীর সবচেয়ে ব্যবহৃত বন্দরগুলোর একটি।
কূটনৈতিক মিশনেও হামলা
সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশনও হামলা চালিয়েছে ইরান।
সৌদি আরবের রিয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে দুটি ড্রোন আঘাত হানে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সেখানে সীমিত অগ্নিকাণ্ড ও সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, কমপ্লেক্সের ভেতরে থাকা সিআইএ স্টেশনও আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।
কুয়েত সিটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। দূতাবাসের আশপাশে ধোঁয়া দেখা গেছে, তবে ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। দূতাবাস ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত’ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয় কর্মী ও তাদের পরিবারকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেট জেনারেলের পার্কিং এলাকায় সন্দেহভাজন একটি ইরানি ড্রোন আঘাত হানে। এতে আগুন লাগলেও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণে আনে। কনস্যুলেট প্রাঙ্গণে আঘাতের চিহ্ন থাকলেও বড় ধরনের কাঠামোগত ক্ষতি হয়নি।
আরআই/ এসএন