খামেনির ওপর ‘ব্লু স্প্যারো’ আঘাত হেনেছিল ‘মহাকাশ’ থেকে!
ছবি: সংগৃহীত
১০:০৭ এএম | ০৭ মার্চ, ২০২৬
যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ কয়েক ডজন শীর্ষ নেতাকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ‘নির্ভুল’ অভিযান চালিয়ে হত্যা করে ইসরায়েল। ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের মধ্যে এটিকে সবচেয়ে বড় ও নাটকীয় সামরিক পদক্ষেপগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলায় এমন একটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয় যা যুদ্ধবিমান থেকে নিক্ষেপ করে মহাকাশের কিনারা পর্যন্ত উঠে যায় এবং পরে অত্যন্ত উচ্চগতিতে পৃথিবীতে ফিরে এসে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। ইসরায়েলি সূত্রের দাবি, হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রটির নাম ‘ব্লু স্প্যারো’।
এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ১ হাজার ২৪০ মাইল পর্যন্ত দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে এবং এর উড্ডয়নপথ আংশিক ব্যালিস্টিক ধরনের। ফলে এটি স্বল্প সময়ের জন্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে গিয়ে আবার ফিরে আসে। এই বিশেষ গতিপথের কারণে অনেক প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়াতে পারে ক্ষেপণাস্ত্রটি।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানান, তেহরানে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে পরিচালিত একটি বৃহত্তর সামরিক অভিযানের অংশ ছিল এই হামলা।
রাজধানীর পাস্তুর স্ট্রিটে অবস্থিত খামেনির কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত কমপ্লেক্সে হামলা চালানো হয়, যেখানে সে সময় সামরিক ও রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
হামলার পরদিন সকালে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করে যে ৮৬ বছর বয়সী ধর্মীয় নেতা খামেনি ওই হামলায় নিহত হয়েছেন।
মহাকাশ ঘুরে আসা ক্ষেপণাস্ত্র
এই হামলার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘ব্লু স্প্যারো’ ক্ষেপণাস্ত্র। মূলত ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পরীক্ষায় শত্রুপক্ষের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের অনুকরণে এটি তৈরি করা হয়েছিল।
ইসরায়েলের ‘স্প্যারো’ ক্ষেপণাস্ত্র সিরিজের অংশ এই অস্ত্র। একই সিরিজের অন্য দুটি ক্ষেপণাস্ত্র হলো ‘ব্ল্যাক স্প্যারো’ ও ‘সিলভার স্প্যারো’। এগুলো মূলত উপসাগরীয় যুদ্ধে ব্যবহৃত সোভিয়েত নকশার ‘স্কাড’ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো হুমকি অনুকরণ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
পরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষেপণাস্ত্রকে বাস্তব অভিযানের জন্য উপযোগী করে তোলা হয়। প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিটার লম্বা এবং প্রায় ১ দশমিক ৯ টন ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধবিমান থেকে নিক্ষেপ করা যায়।
ইসরায়েলের বহুল ব্যবহৃত যুদ্ধবিমান ‘এফ-১৫ ইগল’ থেকেও এটি উৎক্ষেপণ করা সম্ভব।
ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপের পর একটি বুস্টার রকেটের সাহায্যে অনেক উঁচুতে উঠে যায়। এরপর এটি খাড়া কোণে দ্রুতগতিতে নিচে নেমে আসে। এই বিশেষ উড্ডয়নপথের কারণে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় খুবই কম থাকে।
ইসরায়েলি সূত্রের দাবি, হামলার পর পশ্চিম ইরাকের একটি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রটির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সেটিই ছিল তেহরানের দিকে ক্ষেপণাস্ত্রটির সম্ভাব্য উড্ডয়নপথ।
বহু বছরের গোয়েন্দা নজরদারি
এই হামলা শুধু উন্নত অস্ত্রের ফল নয়। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং সামরিক সাইবার গোয়েন্দা দল ‘ইউনিট ৮২০০’-এর দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা তৎপরতার ফল বলে মনে করা হচ্ছে।
অভিযান সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খামেনির নিরাপত্তা ব্যবস্থার গতিবিধি দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দারা। তার বাসভবনের আশপাশের ট্রাফিক ক্যামেরা ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও নজরদারির আওতায় ছিল।
গোয়েন্দা তথ্য থেকে জানা যায়, শনিবার সকালে খামেনির সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে অংশ নিতে ইরানের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা উপস্থিত থাকবেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
খামেনি সাধারণত রাতের বেশির ভাগ সময় বাসভবনের নিচে গভীর ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে কাটাতেন বলে জানা যায়। ইরানি কর্মকর্তারা মনে করতেন, এতে তিনি বিমান হামলা থেকে নিরাপদ থাকবেন।
কিন্তু সেই ধারণাকেই কাজে লাগায় ইসরায়েল। রাতের বদলে এমন একটি সময় বেছে নেওয়া হয়, যখন খামেনি ও তার শীর্ষ সহযোগীরা ভূগর্ভের বাইরে বৈঠকে ছিলেন।
হামলার ঠিক আগে ওই এলাকায় মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক সাময়িকভাবে ব্যাহত করে দেয় ইসরায়েলি সাইবার ইউনিট, যাতে কোনো সতর্কবার্তা দ্রুত পৌঁছাতে না পারে।
যেভাবে ঘটেছিল হামলা
অভিযানের দিন সকালে স্থানীয় সময় প্রায় সাড়ে সাতটার দিকে ইসরায়েলের কয়েকটি যুদ্ধবিমান আকাশে উড্ডয়ন করে। এর মধ্যে ছিল এফ-১৫ ঈগল যুদ্ধবিমানও।
প্রায় দুই ঘণ্টা পর বিমানগুলো হামলার উপযুক্ত অবস্থানে পৌঁছায়। স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৯টা ৪০ মিনিটে তেহরানের কেন্দ্রের দিকে প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
খামেনির কমপ্লেক্স ও আশপাশের স্থাপনায় প্রায় ৩০টি নির্ভুল হামলা চালানো হয় বলে জানা গেছে। এর মধ্যে কয়েকটি ছিল ব্লু স্প্যারো ক্ষেপণাস্ত্র, যা অত্যন্ত উচ্চগতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তেহরানের বিভিন্ন স্থান থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ নেতার বাসভবনের এলাকাও ছিল।
সন্ধ্যার মধ্যে খামেনির কমপ্লেক্সের একাধিক ভবন গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়।
পরদিন সকালে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, হামলায় খামেনি ছাড়াও ইরানের এলিট বাহিনী ‘ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডার নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি, খামেনি ছাড়াও এই হামলায় ইরানের ৪০ জনেরও বেশি শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ ও দেশটির সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা আব্দুর রহিম মুসাভি, খামেনির মেয়ে, নাতি-নাতনি, পুত্রবধূ ও জামাতাও নিহত হন ওই পরিকল্পিত হামলায়।
এসকে/টিএ