অর্থনীতি নাকি নৌবাহিনীকে বাঁচাবেন, কঠিন পরীক্ষার মুখে ট্রাম্প!
ছবি: সংগৃহীত
০৬:৪১ পিএম | ১০ মার্চ, ২০২৬
ইরান যুদ্ধ শুরু করে রীতিমতো উভয় সংকটে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একদিকে বিশ্বজুড়ে চরম অর্থনৈতিক মন্দার পদধ্বনি, অন্যদিকে পারস্য উপসাগরে বড় ধরনের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি।
এখন অর্থনীতি নাকি নৌবাহিনী বাঁচাবেন, তা নিয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পথ যতদিন বন্ধ থাকবে, অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ তত বাড়তে থাকবে।
এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন একসঙ্গে কয়েকটি পথে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে রয়েছে—প্রণালি দিয়ে আবার তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল শুরু করতে জটিল সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা, বাজারে হস্তক্ষেপ করে জ্বালানির দাম কমানোর উপায় খোঁজা এবং জনমত শান্ত রাখতে প্রচার চালানো যে জ্বালানির চড়া দাম সাময়িক।
তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি
যুদ্ধের কারণে অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ মার্কিন ডলারের ওপরে উঠেছে। বৈশ্বিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদনও ধীর হয়ে পড়ছে।
এশিয়ার কোন দেশে জ্বালানি তেলের মজুত কত?
কুয়েত, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় উৎপাদক দেশগুলোতে তেল সংরক্ষণের ট্যাংক ভরে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই কূপ বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একবার কূপ বন্ধ হয়ে গেলে তা আবার দ্রুত চালু করা কঠিন। ফলে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে চলমান সামরিক অভিযানের পরিসর ও ধরন পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প পরিকল্পনা
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকট দ্রুত সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে মার্কিন নৌবাহিনীর ট্যাংকার এসকর্ট মিশন। এতে যুদ্ধজাহাজ দিয়ে তেলবাহী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালি পার করানো হবে।
তবে এ পরিকল্পনায় বড় ঝুঁকিও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস প্রস্তুত থাকলেও প্রণালির বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান হরমুজ প্রণালিকে কার্যত দুই ভাগে ভাগ করেছে—একদিকে তাদের প্রচলিত নৌবাহিনী, অন্যদিকে শক্তিশালী ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। বিপ্লবী গার্ডের হাতে রয়েছে মাইন পাতা নৌকা, বিস্ফোরকবোঝাই আত্মঘাতী বোট এবং উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি।
সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘মৃত্যু উপত্যকা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাহাজে হামলার শঙ্কা
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ইরান হয়তো উপসাগরে ঢোকার সময় নয়, বরং তেল বোঝাই করে বের হওয়ার সময় জাহাজে হামলা চালাতে পারে। এতে ক্ষয়ক্ষতি ও অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক বেশি হবে।
সবচেয়ে আগে লক্ষ্যবস্তু হতে পারে এলএনজি ট্যাংকার। কারণ এসব জাহাজে হামলা হলে তা বড় বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এরপর তেলবাহী জাহাজে হামলা হলে পরিবেশ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন ইরানের নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া কঠিন।
বিকল্প পদক্ষেপ
সামরিক পরিকল্পনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র বাজার স্থিতিশীল রাখতে অন্য পথও খুঁজছে। মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছেন, তেলের উচ্চ মূল্য হয়তো কয়েক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হবে না।
হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা তেল কোম্পানির নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, যাতে জ্বালানির দাম কমানোর উপায় বের করা যায়।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় জরুরি তেল মজুত ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। যদিও এখনো সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
একই সঙ্গে, কিছু রুশ তেল বাজারে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা এবং ভেনেজুয়েলার উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ
এই সংকট শুধু ভূরাজনীতির নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় জ্বালানির দাম বাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে।
তবে জ্বালানি শিল্পের অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, শেষ পর্যন্ত সমাধান একটাই হরমুজ প্রণালী আবার চালু করা।
একজন তেল শিল্প নির্বাহী বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত বৈশ্বিক অর্থনীতি কার্যত জিম্মি হয়ে থাকবে।’