ইরান যুদ্ধের ব্যয় আরব দেশগুলোর কাছ থেকে আদায়ের কথা ভাবছেন ট্রাম্প
ছবি: সংগৃহীত
০৩:২৮ পিএম | ৩১ মার্চ, ২০২৬
ইরান যুদ্ধের ব্যয় বহন নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। হোয়াইট হাউস ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধের বিপুল খরচ আরব দেশগুলোর কাছ থেকে আদায়ের বিষয়টি বিবেচনা করছেন। এতে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি কূটনৈতিক সমীকরণও নতুন মোড় নিতে পারে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের খরচ আরব দেশগুলোর কাছ থেকে পরিশোধ করানোর বিষয়ে আগ্রহী। এই যুদ্ধের ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের মতো এবারও কি আরব দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ব্যয় বহন করবে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সোমবার (৩০ মার্চ) ট্রাম্পের মুখপাত্র ক্যারোলিন লিভিট জানান, ‘এটা এমন একটি বিষয়, যা প্রেসিডেন্ট তাদের (আরব দেশগুলোর) কাছে চাওয়ার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী হতে পারেন’। তিনি বলেন, ‘আমি তার আগে কিছু বলতে চাই না, তবে এটি এমন একটি ধারণা, যা তার আছে এবং এ বিষয়ে তার কাছ থেকে আরও কিছু শোনা যাবে।’
১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে কুয়েতে ইরাকের আগ্রাসন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র বহু দেশের একটি জোট গঠন করেছিল। সে সময় জার্মানি ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশ মিলিয়ে প্রায় ৫৪ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়েছিল, যা বর্তমান মূল্যে প্রায় ১৩৪ বিলিয়ন ডলারের সমান।
তবে এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের মিত্র বা আঞ্চলিক দেশগুলোকে সম্পৃক্ত না করেই একতরফাভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ডানপন্থি ভাষ্যকার শন হ্যানিটি বলেন, যেকোনও যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানকে এই যুদ্ধের খরচ পরিশোধ করতে বাধ্য করা উচিত। তিনি বলেন, ‘এই সামরিক অভিযানের পুরো খরচ ইরানকে তেলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে পরিশোধ করতে হবে।’
অন্যদিকে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করাকে নিজেদের শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে ইরান জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তা এবং অন্তত ২১৬ শিশু রয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ধ্বংস হয়েছে।
এর জবাবে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা আঞ্চলিক দেশগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। তেহরানের এই হামলায়ও প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে। ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এই প্রণালির মাধ্যমেই বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তারা পুরো অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে তেহরান একাধিক উপসাগরীয় দেশে হোটেল, বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোর মতো বেসামরিক স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনে ব্যয় হয়েছে ১১.৩ বিলিয়ন ডলার। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) জানিয়েছে, সংঘাতের ১২তম দিনে এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৬.৫ বিলিয়ন ডলারে। যুদ্ধ এখন ৩১তম দিনে প্রবেশ করায় প্রকৃত ব্যয় আরও অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউস কংগ্রেসের কাছে অন্তত ২০০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত সামরিক বাজেট চেয়েছে, যাতে ইরান অভিযানের খরচ ও পেন্টাগনের অস্ত্র মজুদ পুনরায় পূরণ করা যায়। এছাড়া এই যুদ্ধের কারণে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন (৩.৮ লিটার) পেট্রোলের গড় দাম এখন ৩.৯৯ ডলার, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ১ ডলারের বেশি বেড়েছে।
ক্যারোলিন লিভিট বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লেও এটি সাময়িক। তার ভাষায়, ‘আমরা বারবার বলেছি, এগুলো স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ এবং স্বল্পমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধি, যা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র, আমাদের সেনা ও মিত্রদের নিরাপত্তার জন্য ইরানের হুমকি দূর করতে সহায়ক হবে।’ ইরান দাবি করেছে, কূটনৈতিক আলোচনার মাঝেই তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্র বা অঞ্চলের জন্য কোনও হুমকি ছিল না।
আইকে/টিএ