ইন্টারনেট বন্ধে কতক্ষণ লাগবে, সময় জানতে চেয়েছিলেন পলক: ট্রাইব্যুনালে বিটিসিএল কর্মকর্তা
ছবি: সংগৃহীত
০৬:২৮ পিএম | ২১ এপ্রিল, ২০২৬
সাবমেরিন ক্যাবল পর্যায়ে ইন্টারনেট বন্ধ নিয়ে সরাসরি ফোনে সময় জানতে চেয়েছিলেন তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে এ তথ্য উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) এক কর্মকর্তা।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন ইন্টারনেট বন্ধ করে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তিনি পাঁচ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। নিরাপত্তার স্বার্থে তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
এ মামলায় জুনায়েদ আহমেদ পলক ছাড়াও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে আসামি করা হয়েছে। পলাতক থাকায় তার পক্ষে আইনি লড়াই করছেন সরকারি খরচে নিয়োগ পাওয়া (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী মনজুর আলম।
বিটিসিএল-এর এই কর্মকর্তা এর আগে প্রেষণে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদটি শূন্য এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া চলমান থাকায় তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ১৮ জুলাই সন্ধ্যা ৭টার পর ‘১৮ জুলাই আইটিসি অপারেশনস’ নামে হোয়াটসঅ্যাপে একটি গ্রুপ খোলে বিটিআরসি। গ্রুপে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে ডিজিএম আব্দুল ওয়াহাবকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সরকারি কোম্পানি হিসেবে সাবমেরিন ক্যাবলের পাশাপাশি বিটিসিএল-এর প্রতিনিধি আনোয়ার হোসেন মাসুদকেও যুক্ত করা হয়। রাত পৌনে ৮টায় গ্রুপে একটি ভয়েস কলের মাধ্যমে ইন্টারনেট বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্ত জানিয়ে নির্দেশনা দেন বিটিআরসির তৎকালীন মহাপরিচালক কাজী মোস্তাফিজুর রহমান। এছাড়া আগে থেকেই ‘আইআইজি অপারেশনস’ নামে বিটিআরসির আরেকটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ চালু ছিল। ওই গ্রুপে একটি এসএমএসের মাধ্যমে সবাইকে ইন্টারনেট বন্ধ করে ইংরেজিতে ‘Done’ লিখে জানানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সাক্ষী বলেন, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির প্রধান কাজ সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া। তাই সাবমেরিন ও আইআইজি; এই দুই স্তরেই ইন্টারনেট বন্ধের কথা শুনে অনেকটা বিস্মিত হই। আমি ওয়াহাবকে শুধুমাত্র ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) পর্যায়ে ইন্টারনেট বন্ধের সম্মতি দেই। ওই সময় সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির গ্রাহক সংযোগ ছিল প্রায় ২৭০০ জিবিপিএস। যা তখন দেশের মোট সংযোগের ৪০ শতাংশ। ১৮ জুলাই রাত ৮টায় আমাকে ফোন করেন ওয়াহাব। তিনি জানান, সাবমেরিন ক্যাবল পর্যায়ে কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় সাবমেরিন ব্যান্ডউইথ বন্ধের জন্য নির্দেশনা দিয়েছে বিটিআরসি। অথচ এর আগে কখনো সাবমেরিন পর্যায়ে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়নি। তাই এমন নির্দেশনা শুনে আমি হতচকিত হই।
জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ওই দিন রাত পৌনে ৯টার দিকে বিটিসিএল-এর এই কর্মকর্তাকে ফোন করেন বিটিআরসির তৎকালীন ডিজি কাজী মোস্তাফিজুর রহমান। ফোনে সাবমেরিন পর্যায়ে ইন্টারনেট বন্ধ করার নির্দেশনা দেন তিনি। কিছুক্ষণ পর ওয়াহাব জানান যে, আইটিসি ও আইআইজি অপারেটররা নিজেদের ব্যান্ডউইথ শাটডাউন করেছে। এরপর বিটিসিএলও বন্ধ করে দেয়। তখন শুধুমাত্র সাবমেরিন ক্যাবলের ব্যান্ডউইথ চালু ছিল। তবে সাবমেরিনের ব্যান্ডউইথ বন্ধ না করায় ‘আইআইজি অপারেশনস গ্রুপে’ মন্তব্য করছিলেন বিভিন্ন অপারেটর।
বিটিসিএল কর্মকর্তা বলেন, ১৮ জুলাই রাত ৯টার দিকে আমাকে সরাসরি ফোন করেন তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। বিটিআরসির নির্দেশনা কেন পালন করছি না তা তিনি জানতে চান। এছাড়া সাবমেরিন পর্যায়ে ইন্টারনেট বন্ধ করতে কত সময় লাগতে পারে তা জিজ্ঞেস করেন তিনি। তখন ১৫ মিনিট লাগবে বলে জানানো হয়। তিনি আমাকে ইন্টারনেট বন্ধ করে নিশ্চিত করতে বলেন। এরপর অধীনস্থ জেনারেল ম্যানেজার অপারেশনসের মাধ্যমে কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় সাবমেরিন ক্যাবল শাটডাউনে সরকারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেই। ১৫ মিনিটের মধ্যেই সাবমেরিন দুটো বন্ধ করা হয়।
তিনি বলেন, ২৩ জুলাই বিটিআরসিতে একটি সভা হয়। সভায় বিভিন্ন অপারেটর, বিটিসিএল, সাবমেরিন ক্যাবল, বিটিআরসি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, আইসিটি বিভাগসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার অংশ নেন। সভা শেষে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। ওই সম্মেলনে রাতের মধ্যেই ইন্টারনেট চালু করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেন। এরপর ওই রাতে সাবমেরিন ক্যাবল পর্যায়ে ইন্টারনেট চালু করার নির্দেশনা দেয় বিটিআরসি। রাত পৌনে ৯টায় সাবমেরিনের ব্যান্ডউইথ চালু করা হয়।
এছাড়া ৫ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে পুনরায় সাবমেরিন ব্যান্ডউইথ বন্ধের নির্দেশনা দেন বিটিআরসির তৎকালীন ডিজি মোস্তাফিজুর রহমান। ওই দিন বেলা ১১টায় সাবমেরিন ব্যান্ডউইথ বন্ধের ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তীতে দুপুর সোয়া ১টার দিকে সাবমেরিন চালু করার নির্দেশনা দেন তিনি। এরপর সঙ্গে সঙ্গে চালু করা হয় বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন বর্তমানে বিটিসিএল-এ কর্মরত এই কর্মকর্তা।
এসএস/টিকে