পাকিস্তানে জনপ্রিয় হচ্ছে নারীদের বিনামূল্যের ‘গোলাপি স্কুটি’
ছবি: সংগৃহীত
১২:৪২ এএম | ২২ এপ্রিল, ২০২৬
পাকিস্তানের সিন্ধু প্রাদেশিক সরকার নারীদের চলাচল সহজ ও স্বনির্ভরতা বাড়াতে চালু করা বিনামূল্যের ‘গোলাপি স্কুটি’ প্রকল্প এবার হায়দরাবাদেও সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে সিন্ধুর সুক্কুর শহরে সফলভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর এ উদ্যোগ নেওয়া হলো।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে সিন্ধু প্রদেশের সরকার ‘ফ্রি পিংক ইভি স্কুটি স্কিম’ নামে একটি প্রকল্প চালু করে। চালুর দিনই পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো অন্তত ২০০ নারীকে বিনামূল্যের গোলাপি বৈদ্যুতিক স্কুটি প্রদান করেন। এরপর চলতি বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আরও ৩০০ নারীকে বিনামূল্যে এ স্কুটি দেওয়া হয়।
সিন্ধুতে চালু হওয়া এ স্কিমটি নারীদের জন্য নতুন ও ব্যতিক্রমী হওয়ায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। এরপর সম্প্রতি প্রাদেশিক সরকার হায়দরাবাদেও এ প্রকল্প সম্প্রসারণের ঘোষণা দেয়; এর ফলে প্রকল্পটির জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা দিন বাড়ছে বলে মনে করছে সিন্ধু গণপরিবহণ কর্তৃপক্ষ।
প্রাদেশিক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী শারজিল ইনাম মেমন জানান, সিন্ধুর সুক্কুরে সফলভাবে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর শিগগিরই হায়দরাবাদের নারীরাও এ সুবিধা পাবেন। এ কর্মসূচির আওতায় নারীদের শুধু বিনামূল্যে স্কুটি দেওয়া হয় না, পাশাপাশি তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স, হেলমেট এবং নিরাপদে চলাচলের জন্য প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।
এক বিবৃতিতে মন্ত্রী বলেন, নারীদের ক্ষমতায়ন ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানো প্রাদেশিক সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি জানান, স্কুটি প্রকল্পের পাশাপাশি ‘পিপলস বাস সার্ভিস’ নেটওয়ার্কও সুক্কুর ও শিকারপুরের বাইরে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
শিগগিরই নতুন কয়েকটি রুট চালু করা হবে, যার মধ্যে রয়েছে খায়েরপুর থেকে রোহরি এবং খায়েরপুর থেকে রানিপুর। পাশাপাশি হায়দরাবাদে কোহসার হায়দর চৌক থেকে তান্ডো আল্লাহইয়ার পর্যন্ত বাসসেবা চালুর প্রস্তুতিও চলছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো- সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী, মানসম্মত ও আরামদায়ক পরিবহণ সুবিধা নিশ্চিত করা। তিনি উল্লেখ করেন, বিশেষ করে নারী, তরুণ এবং শ্রমজীবী মানুষের সরাসরি উপকারে আসে-এমন প্রকল্পগুলোকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে সিন্ধু সরকার।
প্রকল্পের লক্ষ্য
এ প্রকল্পের লক্ষ্য হলো- নারীর ক্ষমতায়ন এবং টেকসই পরিবহণকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া। পাশাপাশি কর্মজীবী নারী ও শিক্ষার্থীদের এমন একটি পরিবহণ ব্যবস্থা দেওয়া, যাতে যানজট এড়ানো যায় ও অনেক সময় অনিরাপদ গণপরিবহণের ওপর নির্ভর করতে না হয়।
বিশ্বের অনেক জায়গাতেই নারীদের জন্য এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়া এক ধরনের সংগ্রাম। নিরাপদ পরিবহণের অভাবে শিক্ষা, চাকরি এমনকি সাধারণভাবে জনপরিসরে উপস্থিত থাকার ক্ষেত্রেও বড় বাধা। এ প্রেক্ষাপটে কোনো নারীর হাতে নিজের গাড়ির চাবি তুলে দেওয়া মানে শুধু যাতায়াতের সুবিধা নয়-এটা তার স্বাধীনতারও একটি অংশ। আর এখানে সেই স্বাধীনতা এসেছে বৈদ্যুতিক, আর কিছুটা গোলাপি রঙে।
তবে স্কুটি পাওয়ার প্রক্রিয়াটিও নিয়ন্ত্রিত। আবেদনকারীকে স্থানীয় বাসিন্দা হতে হবে, বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে যে তিনি কর্মজীবী বা শিক্ষার্থী। এরপর স্বচ্ছ লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয়। এমনকি স্কুটি পাওয়ার আগে দক্ষতার পরীক্ষাও দিতে হয়।
এর সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে নিবন্ধন, বীমা, হেলমেট এবং চালনার প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি তৈরি করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক চার্জিং স্টেশন। অর্থাৎ পুরো একটি সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা রয়েছে।
দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে এ প্রকল্প
পাকিস্তানে ‘পিংক স্কুটি’ প্রকল্প জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তবে এটি এখনো মূলত একটি সরকারি উদ্যোগভিত্তিক সীমিত জনপ্রিয়তা, সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া সাধারণ ট্রেন্ড নয়। সিন্ধুতে চালু হওয়া এ স্কিমটি নারীদের জন্য নতুন ও ব্যতিক্রমী হওয়ায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। সরকার নিজেই জানিয়েছে, সুক্কুরে সফল বাস্তবায়নের পর প্রকল্পটি আরও শহরে (যেমন হায়দরাবাদ) সম্প্রসারণ করা হচ্ছে-যা এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
এটি নারীদের নিরাপদ ও স্বাধীন যাতায়াতের সুযোগ দিচ্ছে, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী নারীদের জন্য-যা অনেকের কাছে বড় সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পিংক স্কুটি পাকিস্তানে একটি ‘উদীয়মান ও আলোচিত উদ্যোগ। এ প্রকল্পটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। মানুষের আগ্রহ আছে। কিন্তু এখনো সীমিত পরিসরে। অর্থাৎ, এটি এখনো গণপরিবহণ বা সাধারণ যানবাহনের মতো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত না হলেও নারী ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে দ্রুত পরিচিতি পাচ্ছে।
যোগ্যতা ও নির্বাচন
এ প্রকল্পের আওতায় বৈধ মোটরসাইকেল বা গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী ছাত্রী ও কর্মজীবী নারীরা আবেদন করতে পারেন। উপকারভোগীদের অন্তত সাত বছর স্কুটি বিক্রি বা হস্তান্তর না করার অঙ্গীকার করতে হবে।সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা আবেদনকারীদের স্বচ্ছ লটারির মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে এবং পরিবহণ, এক্সাইজ ও অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির তত্ত্বাবধানে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। নির্বাচিতদের স্কুটি পাওয়ার আগে সড়ক নিরাপত্তা–সংক্রান্ত দক্ষতা পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হতে হয়।
সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি
সিন্ধু সরকার এ প্রকল্পকে নারীর ক্ষমতায়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখছে। স্বতন্ত্র, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব যাতায়াত নিশ্চিতের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো, গণপরিবহনের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং টেকসই পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
সিন্ধু গণপরিবহণ কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়, যাতে শহর ও গ্রাম—উভয় এলাকার নারীরা সহজেই অংশ নিতে পারেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ, স্বচ্ছ ও ন্যায্যভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যাতে সব শ্রেণি-পেশার নারীরা সমান সুযোগ পান।
সীমাবদ্ধতাও আছে
এটি এখনো লটারি বা নির্দিষ্ট নির্বাচনের মাধ্যমে সীমিত সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, তাই সাধারণভাবে ‘সব জায়গায় জনপ্রিয়’ বলা যায় না। সমালোচনাও রয়েছে-বিশেষ করে রঙ (গোলাপি) ও প্রতীকী দিক নিয়ে। এটি মূলত সিন্ধু প্রদেশকেন্দ্রিক; পুরো পাকিস্তানে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি।
এমআই/টিএ