বিপ্লবের গ্রাফিতি মুছে কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেছে ছাত্রদল: শিবির সভাপতি
ছবি: সংগৃহীত
০২:০৫ এএম | ২২ এপ্রিল, ২০২৬
ছাত্রদল জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে না বলেই বিপ্লবের স্মৃতি সম্বলিত গ্রাফিতিগুলো মুছে দিয়ে সেখানে অত্যন্ত আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে সংঘর্ষের ঘটনায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম বলেন, আজ চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ছাত্রশিবিরের জনশক্তির ওপর এক ন্যাক্কারজনক ও বর্বরোচিত হামলা চালায় ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা। সিটি কলেজে ইসলামী ছাত্রশিবিরের স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ দাওয়াতি কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। জুলাই বিপ্লবকে কেন্দ্র করে আমাদের গ্রাফিতি, দেয়াল লিখন এবং শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির স্মরণে দেয়ালচিত্র অঙ্কন করা হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক যে, ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা ধারাবাহিকভাবে আমাদের ব্যানার-ফেস্টুনগুলো ছিঁড়ে ফেলেছে এবং জুলাই বিপ্লবের স্মৃতি সম্বলিত গ্রাফিতিগুলো মুছে দিয়ে সেখানে অত্যন্ত আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করছে। তারা জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে না বলেই এই ধৃষ্টতা দেখিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আজ সকালে আমাদের দায়িত্বশীলরা যখন কলেজ প্রশাসনের কাছে এই ঘটনার নালিশ জানাতে যান, তখন সেখানে আগে থেকেই অবস্থানরত ছাত্রদলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এমনকি পরিস্থিতি শান্ত করতে আসা সম্মানিত শিক্ষকদের ওপরও তারা চড়াও হয় এবং তাঁদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। পরবর্তীতে আমাদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিলে পেছন দিক থেকে রামদা, ক্রিজ ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা পুনরায় হামলা করে। এই হামলায় আমাদের অসংখ্য ভাই গুরুতর আহত হয়েছেন; একজনের পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে। বর্তমানে তাঁরা হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন।
শিবির সভাপতি বলেন, ইসলামী ছাত্রশিবির স্পষ্টভাবে বলেছে-৫ আগস্টের পর ক্যাম্পাস হবে শিক্ষার্থীদের জন্য; কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্য নয়। কিন্তু একটি পক্ষ তা মানতে নারাজ। আমরা বারবার বলছি, ক্যাম্পাসকে শান্ত রাখতে হবে। দীর্ঘদিন পর শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ফিরেছে, এবং সব ছাত্রসংগঠনই তাদের সাংগঠনিক অধিকার প্রয়োগ করছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ক্যাম্পাসে একটার পর একটা পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করার যে প্রবণতাগুলো ছাত্রদলের মধ্যে আমরা দেখছি। শিক্ষার্থীরা তাদের মিছিলে যায় না। দেখবেন এখন মিছিল করলে লোক হচ্ছে না। এটা তাদের মর্মপীড়ার কারণ। কেন শিক্ষার্থীরা তাদের মিছিলে যাচ্ছে না, গণরুম-গেস্টরুম করতে পারছে না, তাদেরকে জোরপূর্বক নিয়ে যেতে পারছে না। তাই তারা পুরোনো সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে।
সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের গণআন্দোলনে রূপ নিতে পারে। এই পরিস্থিতি আড়াল করতে পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পাসগুলোকে উত্তপ্ত করা হচ্ছে, যাতে দুই পক্ষের সংঘর্ষের খবরই গণমাধ্যমে প্রাধান্য পায়। অন্যদিকে, তাদের সিন্ডিকেট বাণিজ্য, ব্যাংক খাতের অনিয়ম, জনগণের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থতা, পুঁজিবাজারের দুরবস্থা, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
একইভাবে, একের পর এক জনবিরোধী আইন সংসদে পাস করা হচ্ছে। পূর্বে ঘোষিত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে প্রায় ২০টি ল্যাপস করা হয়েছে, যার মধ্যে গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার এবং ব্যাংক রেজুলেশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশও রয়েছে। সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে পুরোনো কর্তৃত্ববাদী কাঠামো পুনঃপ্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নেও এখনো গড়িমসি দেখা যাচ্ছে। এই সরকার যে জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি, সে যেন জুলাইয়ের গাদ্দারে পরিণত না হয়। রক্ত নিয়ে তারা যেন জনগণের সাথে তামাশা না করে।
তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আমরা ক্যাম্পাসগুলোতে সকল সংগঠনের সহাবস্থানের দাবি জানিয়ে আসলেও ছাত্রদল একের পর এক সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী সাকিবকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং তার জানাজা পর্যন্ত পড়তে বাধা দেওয়া হয়েছে। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্য অস্ত্র উঁচিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। গত দুই মাসে বর্তমান সরকারের শাসনামলে ৩১ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এবং অসংখ্য ধর্ষণের ঘটনায় সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা জড়িয়ে পড়েছে। ধর্ষণের শতভাগ ঘটনায় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না, যার ফলে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলছে। যারা ছাত্রলীগ করত, তারাই এখন ছাত্রদল কর্তৃক পুনর্বাসিত হয়ে এই অপকর্মগুলো করছে।
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি হয়ে বিএনপি আজ জুলাইয়ের গাদ্দারে পরিণত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনারা জুলাইয়ের রক্ত নিয়ে জনগণের সাথে তামাশা করবেন না।যদি আপনারা গণরায় না মানেন এবং ক্যাম্পাসগুলোতে এই সন্ত্রাসের রাজত্ব বন্ধ না করেন, তবে অচিরেই আপনাদের বড় ধরনের গণবিস্ফোরণের মুখোমুখি হতে হবে। ফ্যাসিস্টদের যে পরিণতি হয়েছে, আপনাদের পরিণতি তার চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। অবিলম্বে সিটি কলেজের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করতে হবে এবং ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। ইসলামী ছাত্রশিবির দেশ গঠনে সহযোগিতা করতে চায়, কিন্তু কোনো প্রকার অন্যায় ও দখলদারিত্ব বরদাস্ত করবে না।
এ সময় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, মিডিয়া সম্পাদক মুতাসিম বিল্লাহ শাহেদী, প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এমআই/টিএ