© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

পাহাড়ের বুকে মৃত্যুফাঁদ, সঙ্গীই যখন বড় শত্রু

শেয়ার করুন:
পাহাড়ের বুকে মৃত্যুফাঁদ, সঙ্গীই যখন বড় শত্রু

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৬:৪২ এএম | ২৭ এপ্রিল, ২০২৬
পাহাড়ে হাইকিং বা অ্যাডভেঞ্চারে যাওয়ার কথা ছিল আনন্দদায়ক এক অভিজ্ঞতা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে আসছে ভিন্ন এক চিত্র। পাহাড়ের চূড়ায় বা দুর্গম পথে সঙ্গীকে, বিশেষ করে নারীদের একা ফেলে রেখে আসার একটি অমানবিক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘আলপাইন ডিভোর্স’। টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে নারীরা শেয়ার করছেন তাদের ভয়াবহ সব অভিজ্ঞতার কথা, যেখানে দেখা গেছে তাদের সঙ্গী তাদের পাহাড়ের মতো বিপজ্জনক স্থানে একা ফেলে রেখে চলে গেছে।

এই বিষয়ের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অস্ট্রিয়ার একটি মর্মান্তিক ঘটনা। চলতি বছরের শুরুর দিকে অস্ট্রিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ গ্রসগ্লকনারে এক ব্যক্তিকে তার প্রেমিকাকে একা ফেলে রেখে যাওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি দাবি করেছিলেন, তিনি সাহায্যের সন্ধানে নিচে নেমেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে ঠান্ডায় জমে মৃত্যু হয় তার প্রেমিকার। আদালতের নথিপত্র থেকে জানা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তিটি সেই সময়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকা সত্ত্বেও জরুরি সংকেত বা সাহায্য চেয়ে কল করেননি। এমনকি অতীতেও তিনি একই ধরনের আচরণ করেছিলেন বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন তার এক প্রাক্তন প্রেমিকা।

‘আলপাইন ডিভোর্স’ আসলে কী?

এটি কোনো আইনি বা আনুষ্ঠানিক পরিভাষা নয়। ১৮৯৩ সালে স্কটিশ-কানাডিয়ান লেখক রবার্ট বারের একটি ছোটগল্প থেকে এই নামটি এসেছে, যেখানে এক স্বামী সুইস আল্পসে তার স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, পাহাড়ি হাইকিংয়ের সময় একজন সঙ্গী (সাধারণত পুরুষ) যখন অন্য সঙ্গীকে (যিনি হাইকিংয়ে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ) কোনো দুর্গম বা বিপজ্জনক স্থানে একা ফেলে রেখে চলে যান, তখন তাকেই বলা হচ্ছে ‘আলপাইন ডিভোর্স’।

মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

পারিবারিক ও সম্পর্ক বিষয়ক পরামর্শক এবং আচরণগত মনোবিজ্ঞানী জো হেমিংসের মতে, এই ধরনের কর্মকাণ্ডের পেছনে দায়ী মানুষের ব্যক্তিত্ব। হেমিংস বলেন, “যারা এই কাজটি করে, তাদের মধ্যে সাধারণত ‘অ্যাভয়ডেন্ট অ্যাটাচমেন্ট’ বা আবেগীয় দূরত্ব বজায় রাখার প্রবণতা থাকে। মানসিক চাপের মুখে তারা সমস্যার সমাধান না করে উল্টো সেই পরিস্থিতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পছন্দ করে।”

পাহাড়ি হাইকিংয়ের মতো রোমাঞ্চকর কর্মকাণ্ডে এক ধরনের ‘হায়ারার্কি’ বা শ্রেণিবিন্যাস তৈরি হয়-কে পথ দেখাবে, কে গতি নির্ধারণ করবে। জো হেমিংসের মতে, সঙ্গীর চেয়ে এগিয়ে গিয়ে নিজের আধিপত্য বা নিয়ন্ত্রণ জাহির করার একটি সূক্ষ্ম মাধ্যম হিসেবেও অনেকে হাইকিংকে ব্যবহার করেন।

এক ভুক্তভোগীর বয়ান

ক্যালিফোর্নিয়ার হাইকার লরি সিঙ্গার এমনই এক তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। ২০১৬ সালে এক দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুর সঙ্গে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালায় হাইকিংয়ে বেরিয়েছিলেন। তার বন্ধুটির পাহাড়ে হাঁটার পূর্ব অভিজ্ঞতা বেশি ছিল এবং লরিকে তিনিই সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। অভিযানের কয়েকদিন পরই লরি ‘অল্টিচিউড সিকনেস’ বা উচ্চতাজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হন। বন্ধুটি তার গতি না কমিয়ে উল্টো লরিকে একা ফেলে এগিয়ে যেতে থাকেন।

লরি সিঙ্গার বলেন, “আমি বারবার তার নাম ধরে ডাকছিলাম, কিন্তু কোনো সাড়া পাচ্ছিলাম না। আমি তখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিলাম। ক্ষুধার্ত অবস্থায় আমার একটাই চিন্তা ছিল-আমি কি আর কোনোদিন আমার পরিবারের মুখ দেখতে পারব?” শেষ পর্যন্ত পথচারী অন্য হাইকারদের সহায়তায় লরি প্রাণে বেঁচে ফিরলেও তার সুস্থ হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগেছিল।

সতর্কতা ও আত্মনির্ভরশীলতা

এই ধরনের অভিজ্ঞতার শিকার ভুক্তভোগীদের মতে, পাহাড়ে হাইকিংয়ের মতো অ্যাডভেঞ্চারে যাওয়ার আগে সঙ্গীকে চেনা এবং নিজের আত্মনির্ভরশীল হওয়া জরুরি। লরি সিঙ্গার সবার উদ্দেশে বলেন, “যাকে আপনি ভালো মনে করেন, অনেক সময় সে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হতে পারে। তাই পাহাড়ে বা অ্যাডভেঞ্চারে যাওয়ার সময় অন্ধবিশ্বাস না করে সবসময় নিজের সুরক্ষা ও পরিস্থিতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখার প্রস্তুতি রাখা উচিত।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আলোচনা ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই এখন সচেতন হচ্ছেন। পাহাড়ের চূড়া থেকে ফিরে আসার পর অনেকেই বুঝতে পারছেন, অনেক সময় সেই সম্পর্কের অবসান পাহাড়ে হারিয়ে যাওয়ার চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে।

সূত্র: সিএনএন

আরআই/টিএ

মন্তব্য করুন