© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

শাপলা চত্বর ট্র্যাজেডি১৩ বছরেও হয়নি বিচার, তদন্ত শেষের পথে দাবি প্রসিকিউশনের

শেয়ার করুন:
১৩ বছরেও হয়নি বিচার, তদন্ত শেষের পথে দাবি প্রসিকিউশনের

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১০:২৯ এএম | ০৫ মে, ২০২৬
শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামীর সমাবেশে তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নারকীয় হামলার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শেষ হয়নি কোনো মামলার বিচার কাজ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বলছেন, শাপলা চত্বরের হত্যাযজ্ঞের মামলার তদন্ত প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ। হেফাজত নেতারা বলছেন, ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধে ‘শাপলা ট্র্যাজেডির’ কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে।

বিচারহীনতার ১৩ বছরে নিহতদের পরিবার এখনো ভুগছে দুঃসহ যন্ত্রণায়। ভুক্তভোগীদের দাবি, সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের সাজা নিশ্চিত করা হোক।

৫ মে ২০১৩। ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষাসহ ১৩ দফা দাবিতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশ। যোগ দিয়েছিলেন সারাদেশ থেকে আসা সংগঠনটির অগণিত নেতাকর্মী। ঢলের মতো এসেছিলেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও। পথে পথে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে জমায়েত হন শাপলা চত্বরে। উত্তাল জনতার স্রোতের জনাকীর্ণ সমাবেশ পণ্ড করতে অভিযানের নামে রাতভর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী; দাবি সংশ্লিষ্টদের।

শাপলা চত্বরের নির্মমতায় মাত্র ২৬ বছর বয়সে স্বামীহারা হন ডালিয়া বেগম। একমাত্র ভাইকে হারান সেদিনের কিশোরী ফারিয়া আহসান স্মরণী।এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এখনো তাদের তাড়া করে নারকীয় বর্বরতার স্মৃতি। দিন যায় মাস যায়, কিন্তু স্বজনের শূন্যতা কাটেনি এসব পরিবারে।

নিহত রেহানের বোন ফারিয়া আহসান স্মরণী বলেন, ‘আমি ওর মাথার পেছনে ধরেছিলাম। আমার এখনো মনে আছে, আমার ডান হাত পুরোটা রক্তে ভরে গেছে। মনে হচ্ছিল বেশি সময় আগে মারা যায়নি। তখনও চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘ময়নাতদন্ত রিপোর্টে এসেছে- গুলিটা খুব কাছ থেকে করা হয়েছে। গুলি নাকের সামনের অংশে দিয়ে ঢুকে পেছন দিক দিয়ে বের হয়ে গেছে এবং ও ঘটনাস্থলে মারা গেছে।’

নিহত হারুন অর রশিদের স্ত্রী ডালিয়া বেগম বলেন, ‘আজ মানুষের ছেলেরা বলে, বাবা এটা এনে দিয়েছে, ওটা এনে দিয়েছে। আমার ছেলেটা বলতে পারে না। ওর তখন দেড় মাস বয়স, আমার ছেলেটা কখনো বুঝতে পারেনি, তার বাবা দেখতে কেমন। ঈদ এলেই বাবাকে এনে দিতে বলে, আমি তখন কী করব?’

হেফাজত নেতাদের দাবি, শাপলার হত্যাযজ্ঞ পতিত সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্রের প্রথম বহিঃপ্রকাশ। বিচার নিশ্চিতের মাধ্যমে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব বলে প্রত্যাশা তাদের।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের বিগত ফ্যাসিবাদ বিরোধী সর্ববৃহৎ বিস্ফোরণ হেফাজতের আন্দোলন। সেটাকে দমন করা হয়েছে, এটা আমাদের ট্র্যাজিক ইতিহাস।’

তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি শাপলা চত্বরের ২০১৩ সালের সে জাগরণের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী ১ যুগ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদীবিরোধী সংগ্রাম টিকে ছিল, সে সূত্রে একপর্যায়ে ফ্যাসিবাদের পতন হলো।’

মামুনুল হক বলেন, ‘এ হৃদয় বিদারক ঘটনা এবং এতো বড় ট্র্যাজেডির যদি বিচার না হয়, শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের কাছে বিচারহীনতার একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।’                                     

সঠিক তদন্ত হলে শাপলা ট্র্যাজেডির নিহতের সংখ্যা আরও বাড়বে দাবি করেন হেফাজতের আরেক নেতা।

সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে তাদের গুন্ডা বাহিনী, পুলিশ ও র‌্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনী আহতদের এমন ভয়ভীতি দেখিয়ে, যাতে তারা যে শাপলা চত্বরে গেছে, সেটাও স্বীকার না করে। এমন ভীতিকর পরিস্থিতিতে ভিকটিম ট্রমা থেকে বের হতে পারে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেকের বাবা শহীদ হয়েছেন, ভাই শহীদ হয়েছেন, কিন্তু তারা স্বীকার করতে ভয় পান। তারা বলে, এটা স্বীকার তারা নিজেরা আবার কোন বিপদে পড়েন।’

২০১৩ সালের মে মাসে আঞ্জুমানে মফিদুল ৫ শতাধিক বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে উল্লেখ করে হেফাজতের এ নেতা বলেন, ‘তারা এক মাসে এতো লাশ দাফন করেছে, এসব লাশ কোথা থেকে এসেছে। আগে-পরে অন্য মাসগুলোতে তারা গড়ে ২০-৩০ জনের লাশ দাফন করেছে। তারা জুরাইন কবরস্থানে যে বেওয়ারিশ লাশগুলো দাফন করেছে, সেগুলো কোথা থেকে এলো? এছাড়া কাজলায় ময়লার স্তূপে মানুষের হাড়, মাথার খুলি পাওয়া গেছে, সেগুলো কার? আমরা মনে করি শাপলা হত্যাকাণ্ডের লাশ গুম করার যে চেষ্টা তারা করেছিল, সেটারই অংশ।’

তিনি বলেন, ‘অধিকতর তদন্ত করা হলে লাশের সংখ্যা আরও বাড়বে। আমরা চাই, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক। এবং এ হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। তাহলে ভবিষ্যতে কোনো সরকার যেন এ ধরনের কাজ করার আগে এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।’

শাপলা চত্বরের নির্মমতার ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সেদিন শাপলা চত্বরে শুধু গুলি করে হত্যা করে শেষ হয়নি, অনেকের লাশও কিন্তু পাওয়া যায়নি। শুধু ঢাকাতেই সমাবেশস্থলে ৩২ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশে এ ধারাবাহিকতায় হত্যাকাণ্ড করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা তদন্ত কাজের ৯০ শতাংশ শেষ করে ফেলছি। দ্রুত এ মামলার কাজ শেষ হবে।’

শাপলা চত্বরের নির্মমতার ধারাবাহিকতা ছড়িয়ে পড়ে নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এর প্রেক্ষিতে, ঢাকাসহ সারাদেশে প্রায় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান বলে দাবি হেফাজতের।

অন্যদিকে, শাপলা স্মৃতি সংসদ নামে একটি সংগঠন সম্প্রতি ওই ট্র্যাজেডিতে নিহত ৬৬ জনের পূর্ণাঙ্গ তালিকা সামনে এনেছে।

এমআর/এসএন 

মন্তব্য করুন