© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

কী কারণে মনজুরকে টানতে পারল না এনসিপি?

শেয়ার করুন:
কী কারণে মনজুরকে টানতে পারল না এনসিপি?

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১০:০৯ পিএম | ০৯ মে, ২০২৬
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক মেয়র এম মনজুর আলমকে শেষ পর্যন্ত দলে টানতে পারেনি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তাকে নগর শাখার আহ্বায়ক করা এবং পরে দলের পক্ষ থেকে সিটি মেয়র হিসাবে মনোনয়ন দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এর আগে চট্টগ্রামে মনজুরের বাসভবনে গিয়ে তাকে এ প্রস্তাব দিয়েছিলেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। এর ওপর ভরসা করেই বৃহস্পতিবার এনসিপি চট্টগ্রামে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের যোগদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান শেষ পর্যন্ত মনজুরকে ছাড়াই এনসিপিকে শেষ করতে হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অনুষ্ঠানের আগে এনসিপির পক্ষ থেকে মনজুর আলমের সঙ্গে নানাভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাদের যন্ত্রণায় (বিরক্ত) মনজুর আলম দুইদিন ধরে যোগাযোগ বন্ধ রাখেন। প্রথমে নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকেন। একপর্যায়ে উত্তর কাট্টলীর বাসা থেকেই তিনি সরে যান। পরে পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার লোকজন বাসায় গিয়েও তাকে খুঁজে পায়নি এবং তার অবস্থান শনাক্ত করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত মনজুর আলমকে ছাড়াই এনসিপির যোগদান অনুষ্ঠান শেষ হয়। কেবল মনজুর আলমই নন; বিএনপি-জামায়াত বা অন্য কোনো দলের উল্লেখযোগ্য কোনো নেতাকে যোগ দিতে দেখা যায়নি। বেশ কিছু লোককে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হলেও তাদের কেউই পরিচিত মুখ নন। ফলে চট্টগ্রামে এনসিপির যোগদান অনুষ্ঠান এক ধরনের হতাশায় পরিণত হয়। যোগদান অনুষ্ঠানটি ছিল একেবারে সাদামাটা। যোগদান অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।

শুক্রবার বিকালেও মনজুর আলমের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তার পরিবারের এক সদস্য দেশের একটি গণমাধ্যমকে জানান, ‘মনজুর আলম এনসিপির (বিরক্তি) যন্ত্রণায় ফোন বন্ধ রেখেছেন। বাসা থেকেও সরেছিলেন। ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে তো কেউ কাউকে কোনো দলে ভেড়াতে পারে না।’ তিনি দাবি করেন, ‘একটি পক্ষ মনজুর আলমকে এনসিপিতে ঠেলে দিতে চায়, তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়।’

এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগর সমন্বয়কারী ও মিডিয়া সেলের প্রধান রিদুয়ান হৃদয় দেশের একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘চসিকের সাবেক মেয়র মনজুর আলম এনসিপিতে যোগদান করবেন বা করার কথা ছিল-এমন কোনো খবর আমার জানা নেই। যোগদান না করায় আমরা হতাশও নই।’

তিনি বলেন, এনসিপিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যোগদান করেছেন। সাবেক প্রধান উপদেষ্টার একজন আত্মীয়ও রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মালেকা আফরোজ যোগ দিয়েছেন। লাভ বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী যোগদান করেছেন। আমাদের অনুষ্ঠান সফল হয়েছে।

সূত্র জানায়, ‘বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও নাগরিকদের জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগদান অনুষ্ঠান’র আয়োজন করে দলটির চট্টগ্রাম মহানগর শাখা। এ অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগে থেকে মনজুরের সঙ্গে এনসিপির পক্ষ থেকে নানাভাবে যোগাযোগ করা হয়। মনজুর মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিলে তার আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কেবল এনসিপি নয়; যোগদান অনুষ্ঠানের একদিন আগে পুলিশ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও তাকে হন্যে হয়ে বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, মূলত মনজুরকে এনসিপির অনুষ্ঠানে উপস্থিত করানো এবং দলটিতে যোগ দেওয়ানোর জন্যই এমন তৎপরতা ছিল।

বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন মনজুর আলমের উত্তর কাট্টলীর বাসভবনে এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ এসেছিলেন। তাকে এনসিপির নগর কমিটির আহ্বায়ক হওয়া এবং সিটি করপোরেশনে নির্বাচনে এনসিপির পক্ষ থেকে তাকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে মনজুর রাজি হননি। যদিও হাসনাত তার সফরকে ব্যক্তিগত সফর এবং মনজুরের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা হয়নি বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু সেই সফর যে রাজনৈতিক এবং মনজুরকে দলে টানা সংক্রান্ত ছিল-সেটি এখন অনেকটাই স্পষ্ট।

মনজুর আলমের বাসায় হাসনাত আবদুল্লাহ বিএনপি নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েন। ‘আওয়ামী লীগ নেতা’ ও ‘ফ্যাসিস্টের পৃষ্ঠপোষক’ মনজুর আলমের বাসায় এসে হাসনাত জুলাইয়ের সঙ্গে গাদ্দারি করেছেন বলে তারা অভিযোগ তোলেন। অবশ্য বিএনপির অপর পক্ষ তাকে উদ্ধার করে বিমানবন্দরে পৌঁছার ব্যবস্থা করে। চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনও এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ‘সংসদে বড় বড় কথা বললেও হাসনাতরা ফ্যাসিস্টদেরই পৃষ্ঠপোষকতা করছেন’ বলে মেয়র শাহাদাত মন্তব্য করেন।

জানা গেছে, চসিকের সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগের এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর শিষ্য ও অনুসারী ছিলেন মনজুর আলম। উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ড থেকে তিনি তিনবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। বহুবার তিনি প্যানেল মেয়র ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত মেয়র ছিলেন ওয়ান-ইলেভেনের প্রায় দুই বছর। ওয়ান-ইলেভেনে মহিউদ্দিন চৌধুরী গ্রেফতার হওয়ার পর তার পরিবারের সঙ্গে মনজুর আলমের দূরত্ব তৈরি হয়। এর সুযোগ নেয় বিএনপি। ২০১০ সালে বিএনপির দুঃসময়ে প্রার্থী সংকটে মনজুর আলমকে বেছে নেওয়া হয়। বিএনপির মনোনয়নে মনজুর আলম তার গুরু মহিউদ্দিন চৌধুরীকে বিপুল ভোটে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে মনজুর হেরে যান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মনজুর আলম এনসিপির ইফতার মাহফিলসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সীতাকুণ্ডে বিএনপি প্রার্থী লায়ন আসলাম চৌধুরীসহ বিএনপির বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে তিনি সরব ছিলেন। ক্ষমতা বা কোনো পদ-পদবিতে না থাকলেও মনজুর আলম সব সময় আলোচনায় ছিলেন। চট্টগ্রামের আদি ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হিসাবে তিনি বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন।

এমআই/টিকে 

মন্তব্য করুন