© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

নিজ জেনারেলদের ওপরই ‘আস্থা’ হারাচ্ছেন শি জিন পিং!

শেয়ার করুন:
নিজ জেনারেলদের ওপরই ‘আস্থা’ হারাচ্ছেন শি জিন পিং!

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১০:০০ এএম | ১১ মে, ২০২৬
বিগত ১৩ বছর ধরে শি চিন পিং যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ এক বিশাল সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার পেছনে নিরলস শ্রম দিয়েছেন। তবে চীনের সামরিক সক্ষমতা যত বেড়েছে, বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে নিজের হাতে বেছে নেওয়া জেনারেলদের ওপর শির আস্থা ততটাই কমেছে। সম্প্রতি বেইজিংয়ে আয়োজিত এক নীতি-নির্ধারণী সভায় শির এই সামরিক শুদ্ধি অভিযানের চিত্রটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে; যেখানে এক বছর আগেও প্রায় ৪০ জন জেনারেলের উপস্থিতি থাকত, সেখানে এবার দেখা গেছে মাত্র হাতেগোনা কয়েকজনকে।

শি জিন পিং স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মাও সে-তুং আমলের মতো বড় ধরনের রদবদলের ধারা এখনো শেষ হয়নি। কঠোর স্বরে তিনি কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছেন যে, সেনাবাহিনীতে এমন কেউ থাকতে পারবেন না যাঁর মনে পার্টির প্রতি বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা আনুগত্যহীনতা রয়েছে।

ক্ষমতায় আসার পর গত ১৩ বছরের মধ্যে শি চিন পিংয়ের জন্য এটি অন্যতম বড় রাজনৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত এক দশক ধরে তিলে তিলে নিজের মনের মতো করে সাজানো সামরিক নেতৃত্বের ওপর থেকেই শেষ পর্যন্ত তিনি আস্থা হারিয়েছেন, যা তাঁর মতো নেতার জন্য একটি বিরল জনসমক্ষে স্বীকারোক্তি। তাইওয়ানের ন্যাশনাল চেংচি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চিয়েন-ওয়েন কু মনে করেন, শির ব্যবহৃত 'বিভক্ত আনুগত্য' শব্দটির গভীর অর্থ রয়েছে। বিশেষ করে যখন তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ লোকেরাই পদচ্যুত হন, তখন কার ওপর তিনি আস্থা রাখতে পারবেন, সেই প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেয়।

এই শুদ্ধি অভিযান শির অন্যতম বড় সাফল্যকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। তিনি চীনের সামরিক বাহিনীকে নতুন বিমানবাহী রণতরি, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারে সমৃদ্ধ এক শক্তিশালী শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। তবে এমন এক সময়ে এই অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি হয়েছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুঙ্গে। শির দাবি অনুযায়ী, সামরিক বাহিনীকে কলঙ্কমুক্ত ও শক্তিশালী করতে এই অভিযান প্রয়োজন হলেও এটি চীনের দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধপ্রস্তুতি ব্যাহত করতে পারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সীমিত অভিযান হিসেবে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কয়েক ডজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার গণপদচ্যুতির ঘটনায় রূপ নিয়েছে, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে চলতি বছরের শুরুতে শির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত কমান্ডার ঝাং ইউক্শিয়ার পতনের মধ্য দিয়ে।

তদন্তের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলে গেছে। পেশাদার যুদ্ধ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জেনারেলদের সরিয়ে শি এখন এমন ব্যক্তিদের স্থলাভিষিক্ত করছেন যাঁরা মূলত তদন্তকারী বা বিচারকের ভূমিকা পালন করেন। এর অন্যতম উদাহরণ জেনারেল ঝাং শেংমিন, যিনি বর্তমানে শির পাশাপাশি চীনের সর্বোচ্চ সামরিক কাউন্শিলের একমাত্র সদস্য হিসেবে টিকে আছেন। ঝাং শেংমিনের উত্থান প্রমাণ করে যে, শি চিন পিং যুদ্ধপ্রস্তুতির চেয়ে আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক আনুগত্যকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা ড্র থম্পসন একে রাজনৈতিক আনুগত্য বনাম পেশাদার দক্ষতা'র দ্বন্দ্ব হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

ক্ষমতার শুরু থেকেই শি তাঁর পূর্বসূরি হু জিনতাওয়ের মতো দুর্বল কর্তৃত্বের পরিণতি এড়াতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর তিনি সেই সব কমান্ডারদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন যাঁরা হু জিনতাওয়ের আমলে অঢেল সম্পদ ও ক্ষমতার মালিক হয়েছিলেন। ২০১৪ সালে গুটিয়ানে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের তলব করে তিনি হুশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, সশস্ত্র বাহিনীর ওপর কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণ বিপজ্জনক পর্যায়ে হ্রাস পেয়েছে। শির মতে, দুর্নীতি ও অবাধ্যতা এতটাই নির্লজ্জ রূপ নিয়েছিল যে, প্রশিক্ষণের নামে ভুয়া মহড়া হতো। তিনি বিশ্বাস করতেন, সেনাবাহিনীতে আনুগত্য ফিরিয়ে আনতে হলে কড়া নজরদারি ও মগজধোলাইয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক কাজ' পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।

২০২২ সালে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর শি ২০২৭ সালের মধ্যে সামরিক সক্ষমতায় আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। তবে ২০২৩ সাল থেকে রকেট ফোর্সের শীর্ষ কমান্ডারের অপসারণ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বরখাস্তের মধ্য দিয়ে স্থিতিশীলতায় ফাটল ধরে। বর্তমানে শি আদর্শিক শুদ্ধীকরণ ও বিপ্লবী রূপান্তর নামের নতুন একটি কর্মসূচি শুরু করেছেন, যা মূলত কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করার একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। গত মাসে বেইজিংয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের সময় শির পাশে প্রধান তদন্তকারী জেনারেল ঝাং শেংমিনের উপস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আনুগত্য নিশ্চিত করার এই কঠোর অভিযান সহসাই থামছে না।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

এমআই/টিকে 

মন্তব্য করুন