নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণযুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তিকে ‘বিজয়’ হিসেবে দেখছে ইরান
ছবি: সংগৃহীত
০৩:২১ এএম | ২৫ মে, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ-সমাপ্তিকারী চুক্তিকে ইরান নিজেদের কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করেছে। ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, আলোচনায় তেহরানকে কোনো বড় ধরনের ছাড় দিতে হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকেই আলোচনার পথে আসতে হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঐতিহাসিক ভাস্কর্যের ছবি পোস্ট করেন, যেখানে প্রাচীন সাসানীয় সাম্রাজ্যের রাজার সামনে এক রোমান সম্রাটকে মাথা নত করতে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি লেখেন, “রোমানদের মনে, রোম ছিল বিশ্বের অবিসংবাদিত কেন্দ্র। ইরানিরা সেই বিভ্রম ভেঙে দিয়েছিল।”
রবিবার এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক চুক্তিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। এর আওতায় হরমুজ প্রণালী পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে এবং ইরান তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিষ্পত্তির প্রতিশ্রুতি দেবে। তবে চুক্তিটি এখনো স্বাক্ষরিত হয়নি এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
চুক্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ- পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বা শীর্ষ নেতারা সম্ভাব্য চুক্তির নির্দিষ্ট শর্ত নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার ফলাফল এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও এটিকে নিজেদের বিজয় হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ ইরানের রয়েছে। কারণ মাত্র দুই মাস আগেও ট্রাম্প “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকেই আলোচনার পথে এগোতে দেখা যাচ্ছে।
ইউরোপীয় পররাষ্ট্র সম্পর্ক পরিষদের বিশ্লেষক এলি গেরানমায়েহ বলেন, ইরান নিজেদের এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে পারছে, যারা দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের চাপ মোকাবিলা করেও টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে। তার মতে, হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণের কারণে তেহরান এখন আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বড় লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়িত হয়নি বলেও বিশ্লেষকদের ধারণা। ইরানের শীর্ষ নেতা ও সামরিক কমান্ডারদের হত্যার পরও দেশটির শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। একই সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্র মিলিশিয়াদের বিষয়ে কোনো শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলেও জানা গেছে।
আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম আমওয়াজ মিডিয়ার সম্পাদক ও বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলী শাবানি বলেন, “কিছু দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য বিজয় দাবি করা সহজ, কারণ বিজয়ের সংজ্ঞাগুলো খুবই একপেশে।” তার মতে, ইরানের নতুন নেতৃত্ব দেখিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে গিয়েও পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে না গিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
বর্তমান সংঘাতে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় এবং উপসাগরীয় কয়েকটি আরব রাষ্ট্রেও হামলা চালায়, যদিও এসব পদক্ষেপে ইরানের নিজের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবু বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে তেহরান বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে নিজেদের আলোচনার অবস্থান শক্তিশালী করতে পেরেছে।
তবে দেশটির সামনে এখনো বড় অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সংকট রয়ে গেছে। যুদ্ধের সময় ইস্পাত কারখানা, শিল্পকারখানা ও পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, যদি আলোচনার ফলে তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল হয় বা বিদেশে থাকা ইরানের কিছু সম্পদ অবমুক্ত করা হয়, তাহলে তেহরান সেটিকেও বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরবে।
আন্তর্জাতিক সংকট পর্যবেক্ষণ গোষ্ঠীর ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, এই সমঝোতা কেবল যুদ্ধবিরতির পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে রূপ নেবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
তার ভাষায়, “এটিকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় বা ইরানের বিজয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বাস্তবে এটি উভয় পক্ষের জন্যই ক্ষয়ক্ষতির পরিস্থিতি তৈরি করেছে।”
এসকে/টিএ