৬০০ বছরে প্রথমবারের মতো কুমিরশূন্য খানজাহান আলীর মাজারের দিঘি
ছবি: সংগৃহীত
০৪:৪৩ পিএম | ০৪ জুন, ২০২৬
বাগেরহাটে হজরত খানজাহান আলী (রহ.)- এর মাজার সংলগ্ন ঐতিহাসিক দিঘিটি প্রায় ৬০০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কুমিরশূন্য হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ কুমিরটিকে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার পর মাজারের খাদেম, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ। তারা নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে দিঘিতে পুনরায় কুমির ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
জানা যায়, ১৪৫৯ সালে মৃত্যুর আগে হজরত খানজাহান আলী (রহ.) নিজেই দিঘিতে ‘কালা পাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’ নামে দুটি কুমির ছেড়ে দিয়েছিলেন বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। এরপর থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কুমিরগুলো এই মাজারের অন্যতম ঐতিহ্যে পরিণত হয়। সর্বশেষ বংশধর কুমিরগুলোর মধ্যে একটি ২০১৫ সালে মারা যায়।
এর আগে ২০০৫ সালে ভারত থেকে কয়েকটি কুমির এনে দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়েছিল। তবে সময়ের ব্যবধানে সেগুলোর বেশ কয়েকটি মারা যায়। সর্বশেষ দুটি কুমিরের মধ্যে একটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে মারা যায়। এরপর দিঘিতে একটি কুমিরই অবশিষ্ট ছিল।
সম্প্রতি ওই কুমিরের আক্রমণে ফাতেমা আক্তার নামে এক শিশুর মৃত্যু হলে বুধবার (৩ জুন) কুমিরটিকে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যায় বন বিভাগ। এরপর থেকেই দিঘিটি কুমিরশূন্য হয়ে পড়ে।
মাজারসংলগ্ন ঘাটের পাশের দোকানি বিনা আক্তার বলেন, জন্মের পর থেকেই তিনি দিঘিতে কুমির দেখে আসছেন। অতীতে কুমির বিভিন্ন প্রাণী শিকার করেছে এবং মানুষকেও আক্রমণ করেছে, তবে কুমিরের কারণে মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনায় দিঘি থেকে কুমির সরিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। তিনি বলেন, শতাব্দীপ্রাচীন এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ায় তারা ব্যথিত।
বরিশাল থেকে আসা দর্শনার্থী আসমা আক্তার বলেন, কুমিরটি একটি শিশুর প্রাণ নিয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কুমিরটিকে আবার দিঘিতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তার মতে, কুমিরটি মাজারের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
দিঘির কুমিরের সঙ্গে সখ্য গড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া স্থানীয় যুবক মেহেদী হাসান তপু বলেন, কুমিরটির সঙ্গে তার বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বন বিভাগের কাছে কুমিরটি হস্তান্তর করতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, প্রায় ৬০০ বছর ধরে এই দিঘিতে কুমির ছিল। ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজন হলে দিঘির চারপাশে ফেন্সিং করে কুমির ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
মাজারের খাদেম জামাল হোসেন বলেন, বিভিন্ন মাজারের নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে। খানজাহান আলী (রহ.)- এর মাজারের অন্যতম ঐতিহ্য ছিল এই কুমির। দুর্ঘটনার কারণে কুমিরটি সরিয়ে নেওয়া হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে পুনরায় কুমির ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।
মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম বলেন, শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় তারা গভীরভাবে শোকাহত। তবে শতাব্দীপ্রাচীন এই ঐতিহ্য সংরক্ষণও জরুরি। তিনি জানান, কুমির দেখতে প্রতিবছর বিভিন্ন ধর্মের হাজারো মানুষ মাজারে আসেন। বিশেষ করে ঈদের সময় প্রতিদিন কয়েক হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে দিঘিতে আবারও কুমির ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এসকে/টিকে