ডায়েটে আছেন মিরপুর চিড়িয়াখানার ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’!
ছবি: সংগৃহীত
০১:৪৮ পিএম | ০৯ জুন, ২০২৬
রাজধানীর মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানা–এর আলোচিত অ্যালবিনো মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’-কে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে মহিষটিকে জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় খাঁচায় পড়ে থাকতে দেখা যাওয়ার দাবি করা হয়, যা নিয়ে অনেকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

কিছু দর্শনার্থীর দাবি, মহিষটি আগের তুলনায় কিছুটা মলিন দেখাচ্ছে এবং হয়তো প্রয়োজনীয় পরিবেশ পাচ্ছে না। এ কারণে প্রাণীটির স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ এসব দাবি নাকচ করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামে পরিচিত অ্যালবিনো মহিষটি সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছে এবং নিয়মিত চিকিৎসা ও পরিচর্যার আওতায় আছে।
পবিত্র ঈদুল আজহার সময় এবার আলোচিত প্রাণী ছিল ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের মহিষটি। নামকরণের কারণে দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও মহিষটি শিরোনাম হয়ে উঠেছিল।
সরেজমিন দেখা যায়, জাতীয় চিড়িয়াখানার এল-৭ খাঁচায় রাখা মহিষটির দুই পাশে দুটি ফ্যান দেওয়া হয়েছে। ফ্যান দুটি চলছিল। মহিষটিও স্বাভাবিকভাবে খাবার খাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়াও করছে।
মহিষটির জন্য মশারির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। যেখানে মহিষটিকে রাখা হয়েছে, তার ওপরে টিনের শেড রয়েছে। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেই শেডের নিচে ইনসুলেটর দেওয়া হয়েছে, যাতে টিন ভেদ করে তাপ কম লাগে মহিষটির গায়ে।
সাভার থেকে চিড়িয়াখানায় আসা মো. স্বাধীন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন দেখলাম, তার চুলগুলো এলোমেলো। তার ওপরে কাক বসে আছে। এ জন্য দেখতে এসেছি। এটি এখানে একাকী অবস্থায় রয়েছে। একা কোনো পশু ভালো থাকতে পারে না।
আরেক দর্শনার্থী বলেন, মহিষটিকে খামারে লালন–পালন করা হয়েছিল কোরবানির জন্য। মানে মহিষটিকে অল্প সময়ে দ্রুত মোটা করে বিক্রি করা ছিল খামারির উদ্দেশ্য। খামারি বেশি করে দানাদার খাবার খাইয়ে মহিষের শরীরে প্রচুর ফ্যাট তৈরি করেছে। মহিষ যত মোটা হবে, তার তত স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকবে। হঠাৎ মৃত্যুরও ঝুঁকি থাকবে। জাতীয় চিড়িয়াখানায় যেহেতু সংরক্ষণ করা হবে, সে কারণে মহিষটি যেন বেশি মোটাও না হয়, আবার চিকনও না হয়, এমন করে রাখতে হবে। মহিষটির বর্তমান বয়স সাড়ে তিন বছর। মহিষের গড় আয়ু ১৫ থেকে ২০ বছর। দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখতে হলে উচ্চ প্রোটিন কমাতে হবে। মহিষকে উচ্চ কার্বোহাইড্রেড দেওয়া কমাতে হবে।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মহিষটির কী খাওয়া উচিত, কতটুকু খাওয়া উচিত, তা ঠিক করতে ১ জুন জাতীয় চিড়িয়াখানায় মেডিক্যাল বোর্ডের বৈঠক হয়েছে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও অন্য কর্মকর্তা, কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতালের পরিচালক, জাতীয় চিড়িয়াখানার ভেটেরিনারি ও পুষ্টিবিদ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী এবং মহিষ প্রজনন ও উন্নয়ন খামারের কর্মকর্তারা। সেই মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী, মহিষকে এখন প্রতিদিন ২৫ কেজি কাঁচা ঘাস, ৫ কেজি খড়, ৫ কেজি দানাদার খাবার এবং পর্যাপ্ত পানি পান করতে দেওয়া হচ্ছে।
খামারে মহিষটিকে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ কেজি করে দানাদার খাবার দেওয়া হতো জানিয়ে চিড়িয়াখানার কর্মকর্তারা বলছেন, এত দানাদার খাবার খাওয়ানো হলে মহিষটির অসুস্থ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। অতিরিক্ত মোটা হওয়ার ঝুঁকিও দেখা দেয়। মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শে দানাদার খাবার কমিয়ে দিনে ৫ কেজি করা হয়েছে। সবুজ ঘাসের পাশাপাশি খড় যুক্ত করা হয়েছে, যাতে মহিষটির ফাইবারের প্রয়োজন মেটে।
প্রাথমিক অবস্থায় খাঁচার সামনে মহিষটির যে পরিচয় ঝুলিয়েছিল চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ, তাতে লেখা ছিল, ‘সাদা মহিষ (ডোনাল্ড ট্রাম্প)’। সেখানে ইংরেজিতে ‘অ্যালবিনো বাফেলো’ও লেখা ছিল। সেটি পরে তা সরিয়ে ফেলা হয়।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনা হওয়ার পর জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম তালুকদারকে বদলি করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর পদ থেকে মো. আতিকুর রহমানকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে।

জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর পরিবর্তন নিয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, আতিকুর রহমান পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। পাশাপাশি তিনি সাময়িক বরখাস্তও হয়েছেন। চাকরিবিধির শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে তিনি বরখাস্ত আছেন। তিনি কী ধরনের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন, তা তদন্ত করে এগুলো জানানো হবে।
রফিকুল ইসলামকে বদলি এবং আতিকুর রহমানের সাময়িক বরখাস্তের সঙ্গে মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের’ সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন শাহজামান খান।
‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের মহিষটির নতুন পরিচয় তুলে ধরেছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। মহিষটির পরিচয় হিসেবে লেখা আছে, অ্যালবিনো বা সাদা মহিষ। এর বৈজ্ঞানিক নাম বুবালাস বুবালিস (Bubalus bubalis)।
সাইনবোর্ডে আরও লেখা হয়েছে, অ্যালবিনো বা সাদা মহিষ মেলানিন (Melanin) উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত বৈচিত্র্যের কারণে শরীরে সাদা রং দেখা যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের মহিষ তাদের সৌন্দর্যের জন্য বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
সাদা মহিষ আকর্ষণীয় জিনগত বৈচিত্র্য হলেও বাণিজ্যিকভাবে দুধ বা মাংস উৎপাদনের জন্য পরিবেশের উপযোগী প্রচলিত কালো মহিষ বেশি লাভজনক ও টেকসই। সাদা মহিষ মূলত গবেষণা, প্রদর্শনী ও জিনসম্পদ সংরক্ষণের জন্য উপযোগী বলেও উল্লেখ করা হয়েছে সাইনবোর্ডে।
তাতে আরও লেখা হয়েছে, এই বিরল অ্যালবিনো মহিষটি আমাদের দেশের মূল্যবান প্রাণিজ জিনসম্পদের একটি অনন্য নিদর্শন। আপনার সামান্য সহানুভূতি, দায়িত্বশীলতা ও মানবিক আচরণ প্রাণীটির সুস্থ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ববোধ প্রদর্শনই একজন সচেতন নাগরিকের পরিচয়।
এসএন