‘ইউনূস কম্পানি’র একটি অংশ চেহারা পাল্টে ফেলেছে, অন্য অংশ পালিয়েছে: গোলাম মাওলা রনি
ছবি: সংগৃহীত
০৭:৩২ পিএম | ১০ জুন, ২০২৬
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করেছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও কলামিস্ট গোলাম মাওলা রনি। তিনি অভিযোগ করেছেন, ইউনূসের ১৮ মাসের শাসনে ক্ষমতাকেন্দ্রিক একটা ‘বাণিজ্যকেন্দ্র’ গড়ে উঠেছিল।
এই ‘বাণিজ্যকেন্দ্র’র সঙ্গে একটি বিশাল গ্রুপ যুক্ত ছিল, যারা ক্ষমতার কেন্দ্রে এসে অনিয়ম-দুর্নীতি করেছে। গোলাম মাওলা রনি এই গ্রুপের নাম দিয়েছেন ‘ইউনূস অ্যান্ড কম্পানি’।
ফেসবুকে দেওয়া এক ভিডিওতে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে ‘ইউনূস অ্যান্ড কম্পানি’, তাদের দশা কী? তাদের সংখ্যা কত? তারা এখন কোথায় আছেন, কিভাবে আছেন, কেমন আছেন, কী করছেন, কী করবেন—এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব। তার আগে বলি, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূস অ্যান্ড কম্পানি’ কেন বললাম।
কম্পানির দুটো অর্থ আছে। এটি বাণিজ্যিক অর্থ। অর্থাৎ মুহাম্মদ ইউনূস ১৮ মাসে তার শাসন ক্ষমতাকেন্দ্রিক যে একটা বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন, সেই বাণিজ্যকেন্দ্রে যারা সিভিলিয়ানদের মধ্যে এই সময়টিতে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন—এদের একটা গ্রুপ আছে। সেখানে ধরেন, আকিজ বশির গ্রুপ, জামায়াতের যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে—তারা এরকম বহু ব্যবসায়ী গ্রুপ, যারা ওই সময় শীর্ষ পর্যায়ে ছিলেন।”
তিনি বলেন, “আরেকটি গ্রুপ হলো, যাদের বাড়ি চট্টগ্রাম এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূস, গ্রামীণ ব্যাংক বা এই পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ এই ধরনের মানুষ, তারা সেনাবাহিনীতে থাকুন, বিজিবিতে, পুলিশ, র্যাব, সিভিল সার্ভিস—সব জায়গাতে প্রচণ্ড দাপট দেখিয়েছেন। ভালো ভালো পদ-পদবিতে থেকেছেন। এটা হলো সেই ‘ইউনূস অ্যান্ড কম্পানি’র আরেকটি পার্ট। ব্যবসায়ী এবং এই আমলাতন্ত্র। এর বাইরে ছিল রাজনীতিবিদদের একটা বিরাট অংশ।
ছোট ছোট রাজনৈতিক দল, তারা অনেকেই ‘ইউনূস অ্যান্ড কম্পানি’র সদস্য, কিন্তু বর্তমান সরকারের সঙ্গে তাদের একটা সমঝোতার ভিত্তিতে সম্পর্ক হয়ে গেছে। তারা অনেকেই মন্ত্রিপরিষদে, পার্লামেন্টে, বিভিন্ন দূতাবাসে, বিভিন্ন করপোরেট হাউসে ইতিমধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন ‘ইউনূস অ্যান্ড কম্পানি’র লোক।”
এর বাইরে এনজিও, ব্যাংকার। এনজিও এবং এই ব্যাংকিং সেক্টরে একটা বিরাট গ্রুপ। তার মধ্যে আবার দুটো শ্রেণি—একটা দেশীয় গ্রুপ, আরেকটা হলো বিদেশি গ্রুপ। যেমন—ব্র্যাক, প্রশিকা, এ রকম যেমন আছে, তার সঙ্গে সঙ্গে আছে অক্সফার্ম, একশনএইড, ইউএসএইড—এ ধরনের এনজিওগুলো। এই এনজিওগুলোর একটা বিরাট লিডিং যারা আছেন, তারা কিন্তু এই ‘ইউনূস অ্যান্ড কম্পানি’র অংশ হিসেবে পুরো ১৮টি মাসে যা ইচ্ছা তাই করতে পেরেছেন। তারা ইচ্ছামতো ফান্ড এনেছেন, ফান্ড খরচ করেছেন, সরকারের টাকা নিয়েছেন। ছোট ছোট জরিপ করার জন্য, একটা রিপোর্ট তৈরি করার জন্য ১০০ কোটি, ১৫০ কোটি টাকা তারা নিয়েছেন।’
গোলাম মাওলা রনি আরো বলেন, এসব অলিগার্ক, হোয়াইট ক্রিমিনাল আবার শেষ সময়টিতে এসে, এদের অনেকে নিরপেক্ষ হওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে পল্টি দিয়েছেন, বেঈমানি করেছেন, মুনাফিকি করেছেন। তারা এই সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এই একটা কম্পানি আছে। এর বাইরে ‘ইউনূস অ্যান্ড কম্পানি’র আরেকটি অংশ, যেমন বিভিন্ন দূতাবাস— মার্কিন দূতাবাস, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দূতাবাস, মালয়েশিয়ান দূতাবাস, পাকিস্তানি দূতাবাস, এ রকম বেশ কয়েকটি দেশ এবং রাষ্ট্র মনে করত যে ইউনূস হলেন তাদের ত্রাতা। তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে এই দূতাবাসগুলোর ভূমিকা ও কর্তৃত্ব ছিল সীমাহীন, অসীম। ‘ইউনূস অ্যান্ড কম্পানি’র এই ডিপ্লোম্যাটিক মিশন এই মুহূর্তে কোন অবস্থায় আছে?
তিনি উল্লেখ করেন, আর আরেকটি বিষয় হলো, ‘ইমপোর্টেড কম্পানি’। যেমন, আলী রীয়াজ, মনির হায়দার, লুৎফে সিদ্দিকী—এ রকম বিদেশ থেকে যাদের আনা হয়েছিল, অসংখ্য। আপনি হয়তো এই কয়জনকে দেখেছেন, কিন্তু এর বাইরে বিভিন্ন করপোরেট হাউসে, বিভিন্ন সরকারি অফিসে, বিভিন্ন সরকারি কম্পানিগুলোতে—সরকারি কম্পানি যেমন, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, পদ্মা পেট্রোলিয়াম—এ রকম অসংখ্য সরকারি কম্পানি রয়েছে। অথবা ধরুন, মেট্রো রেল, এক্সপ্রেসওয়ে—এগুলো পরিচালনার জন্য আলাদা আলাদা কম্পানি গঠন করা আছে। এই কোম্পানির শীর্ষ পদে খোঁজ নিয়ে দেখেন, ইউনূস জামানাতে যারা ছিলেন, তারা এখন কোথায় আছেন।
তার ভাষ্যমতে, ইউনূসের জামানায় ২০ বিলিয়ন ডলার বিদেশ থেকে ঋণ দেওয়া হয়েছে—প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। পরবর্তীতে দেখা গেল, ইউনূস সেগুলো ব্যবহার করতে না পারায় দাতারা এগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু এই যে ২০ বিলিয়ন ডলার আমরা নতুন করে ঋণ হয়েছি।
শেখ হাসিনা রেখে গেছে ১০০ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু ইউনূস সাহেব যখন গেছেন তখন সেটা হয়ে গেছে ১২০ বিলিয়ন ডলার। এক-দুই বিলিয়ন ডলার কমবেশি হতে পারে। এ টাকা কারা খেয়েছে? কোথায় দেওয়া হয়েছে? এর মধ্যে কত পারসেন্ট লুটপাট হয়েছে, কত পারসেন্ট পাচার হয়েছে? এনজিগুলো কত পারসেন্ট পেয়েছে? ‘ইউনূস অ্যান্ড কম্পানি’ কত পারসেন্ট পেয়েছে? রাষ্ট্রের কাজে কী হয়েছে? একটু হিসাব বের করেন।
তিনি আরো বলেন, ইউনূসের জমানায় বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের ফান্ড দেওয়া, সুযোগ দেওয়ার নাম করে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে অথবা ঋণ মওকুফ করে, বিভিন্নভাবে—ঋণ রিশিডিউল করে বিরাট একটা গ্রুপকে সুযোগ দেওয়ার নামে রাষ্ট্রের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা শেষ করে দেওয়া হয়েছে। কখনো সরাসরি সাবসিডিজ দিয়ে, অথবা কখনো পকেট ভারী করে। এই টাকা কারা খেয়েছে, কারা নিয়েছে? এরপর ভর্তুকির নামে, লোকসানের নামে, প্রকল্পের নামে যেসব পাবলিক ওয়ার্কস হয়েছে বা এডিবি বাস্তবায়ন—প্রায় ৩ লক্ষ কোটি টাকা। তারা দুটো এডিবি পেয়েছে—শেখ হাসিনার জমানার এডিবি, আর তার জমানার এডিবি। এই দুটো এডিবিতে অ্যাটলিস্ট পাঁচ থেকে ছয় লক্ষ কোটি টাকার পাবলিক ওয়ার্কস হওয়ার কথা। এটা যে হয়নি, তার তো প্রমাণ নাই। টাকাটা যে জমা পড়েছে, তার কোনো প্রমাণ নেই। এই ৬ লক্ষ কোটি টাকা—কোথায় কোন রাস্তা এই দুই বছরে নির্মিত হয়েছে, কোথায় কতটা পাবলিক ওয়ার্কস হয়েছে, সামাজিক যেসব প্রকল্প চালু ছিল সেগুলোর অবস্থা কী? এগুলো হিসাব করলে আপনি দেখবেন যে মাত্র দুই বছরে ১৫ থেকে ২০ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশি ঋণ, লোকাল ঋণ, সরকারি অর্থ, ঘুষ-দুর্নীতি—সব মিলিয়ে প্রায় ২০ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এই লক্ষ কোটি টাকার কতটুকু রাষ্ট্রের জন্য ব্যয় হয়েছে, সরকারের জন্য ব্যয় হয়েছে, আর কতটুকু ‘ইউনূস অ্যান্ড কম্পানি’র যারা লোকজন রয়েছেন, তাদের পকেটে গেছে? আর যেসব টাকা পকেটে গেছে, দেশের মধ্যে কত আছে, আর দেশের বাইরে কত আছে? এসব হিসাব নিয়ে এখন আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। আলাপ-আলোচনার কারণে এই ‘ইউনূস অ্যান্ড কম্পানি’র খুব কাছাকাছি যারা ছিলেন, তারাই এখন বলার চেষ্টা করছেন যে ১৭ বছর ধরে শেখ হাসিনা এই দেশে যে সর্বনাশ করেছেন, তার চাইতে অনেক বেশি সর্বনাশ করেছে ‘ইউনূস অ্যান্ড কম্পানি’ ১৭ মাসে।
তিনি বলেন, ‘এসব কর্মকাণ্ডের ফলে তাদের নৈতিক শক্তি নেই বললেই চলে। দ্বিতীয়ত, তাদের যে লাজলজ্জা, এটাও উঠে গেছে। এর কারণে বহু মানুষকে অপমান, অপদস্থ, লাঞ্ছিত করতে করতে তাদের এমন একটা অবস্থা হয়ে গেছে—আত্মমর্যাদাবোধ তাদের আর থাকে না। আপনি যেকোনো সম্মানিত লোকরে অসম্মান করবেন, বাজে কথা বলবেন, গালাগাল দেবেন এবং ভালো ভালো পদে থেকে—এই কাজগুলো আপনি যখন করবেন, তখন একটা সময় দেখবেন আপনার যে কতটুকু মূল্যায়ন আছে, সেই মূল্যায়নটা আপনি করতে পারবেন না। কাজেই ‘ইউনূস অ্যান্ড কম্পানি’র শীর্ষ পদে যারা ছিলেন, তারা সবাই প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করার, অপমান করার সর্বোচ্চ শক্তি প্রদর্শন করেছেন। নিজেদের অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য এমন নোংরামি নেই যে, তারা করেননি। ফলে কী হলো, তাদের কোনো মোরাল ক্যারেজ নেই। এই সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে, যারা ‘ইউনূস অ্যান্ড কম্পানি’, তাদের একটা বিরাট অংশের ভোল পাল্টে গেছে। বিরাট অংশ তারেক রহমানের সরকারের সঙ্গে নেগোসিয়েশন করেছে বা একীভূত হয়েছে। আরেকটি অংশ গা ঢাকা না দিলেও তারা চেহারা পাল্টে ফেলেছে। আরেকটি অংশ দেশের বাইরে পালিয়ে চলে গেছে।
টিজে/টিএ