বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাশে মাটি লুট, সমাধানে ‘বৃষ্টির অপেক্ষায়’ ইউএনও!
ছবি: সংগৃহীত
১১:৫১ পিএম | ২০ জুন, ২০২৬
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন ক্যানাল (খাল), সরকারি জমি এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন বিভিন্ন স্থান থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলন ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বারবার অবহিত করা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে চক্রটি। ফলে সরকারি সম্পদ রক্ষা এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন রাত ৯টার পর শুরু হয় মাটি কাটার কার্যক্রম, যা চলে ভোর পর্যন্ত। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে মাটি কাটার তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পায়। এক্সকাভেটর (খননযন্ত্র) এবং শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ট্রলির মাধ্যমে দ্রুতগতিতে মাটি কেটে বিভিন্ন অবৈধ ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের বাহেরমাদী টোলপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যানাল থেকে গভীর গর্ত করে মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি প্রবেশকারী এই ক্যানালটির পাশে রয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং পাকা সংযোগ সড়ক। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে মাটি কাটা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাঁধ ও সড়ক মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং জননিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হবে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সম্পত্তি থেকে মাটি কেটে বিক্রি করছে। এ কাজে স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে তারা দাবি করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি রাতে প্রায় এক হাজার ট্রলি মাটি বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রশাসন ও পুলিশকে বিষয়টি একাধিকবার জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই সরকারি সম্পদ লুটপাট চলছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বানাত ব্যাপারী প্রথমে দাবি করেন, তিনি নিজের জমির মাটি কাটছেন। তবে রাতের বেলায় মাটি কাটার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি না, অন্যরা কাটছে।
জমি তার হলে অন্যরা কীভাবে মাটি কাটছে এ প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনো উত্তর দিতে পারেননি তিনি।
ফিলিপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হক বলেন, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র ক্যানালের মাটি কেটে বিক্রি করছে বলে শুনেছি। তারা প্রভাবশালী হওয়ায় অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পায়। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হবে।
এদিকে সরকারি ক্যানাল ও বাঁধ রক্ষায় দ্রুত অভিযান পরিচালনা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সরকারি সম্পত্তি রক্ষার স্বার্থে গত বৃহস্পতিবার দৌলতপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যসহকারী শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে অভিযোগটি দাখিল করেন। তবে অভিযোগ দায়েরের পরও শনিবার পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাদের দাবি, থানায় অভিযোগ দেওয়ার পরও শুক্রবার রাত পর্যন্ত অবাধে মাটি কাটা চলেছে।
এ বিষয়ে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, অভিযোগটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে অবৈধ মাটি কাটা বন্ধে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। কিন্তু মাটি কাটা চক্রগুলো বেশিরভাগ সময় রাতের বেলায় কাজ করে। অনেক সময় অভিযানে গিয়ে তাদের পাওয়া যায় না। পুরোপুরি মাটি কাটা বন্ধ করতে হলে বৃষ্টিরও প্রয়োজন রয়েছে।
তবে ইউএনও’র এমন বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রশ্ন, প্রশাসনের আইন প্রয়োগের সক্ষমতা যদি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সরকারি সম্পদ রক্ষা করবে কে? দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে চলতে থাকা অবৈধ মাটি উত্তোলন বন্ধ করতে না পারা প্রশাসনের ব্যর্থতা নাকি অন্য কোনো প্রভাবের ফল, সে প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্যানাল ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থেকে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের বিষয়টি শুধু পরিবেশগত ক্ষতিই নয়, বরং জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। তাই বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রশাসনের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
টিজে/টিএ