© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

নিকুঞ্জে নিখোঁজের একদিন পর ডোবায় মিলল শিশু মাহাদীর মরদেহ

শেয়ার করুন:
নিকুঞ্জে নিখোঁজের একদিন পর ডোবায় মিলল শিশু মাহাদীর মরদেহ

ছবি: সংগৃহীত

তাসবির ইকবাল, মোবাইল জার্নালিস্ট
১০:১৬ পিএম | ২৪ জুন, ২০২৬
মসজিদের মাইকে বারবার উচ্চারিত হয়েছে তার নাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তার নিষ্পাপ মুখের ছবি। একটি ছোট্ট শিশুর সন্ধানে গত একদিন ধরে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর প্রার্থনায় কেটেছে নিকুঞ্জ, টানপাড়া ও খিলক্ষেত এলাকার মানুষের সময়। সবাই অপেক্ষা করছিলেন একটি সুখবরের জন্য। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হলো এক হৃদয়বিদারক পরিণতিতে।

মঙ্গলবার সকাল থেকে নিখোঁজ থাকা তিন বছর বয়সী শিশু মাহাদী, পিতা মিজানুর রহমান ও মাতা স্মৃতি—কে বুধবার নিকুঞ্জ-১ এর খেলার মাঠ সংলগ্ন জামতলা এলাকার একটি উন্মুক্ত জলাশয় থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। মাহাদীর পৈতৃক বাড়ি বরগুনা জেলায়।

শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই পুরো এলাকাজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক খোঁজাখুঁজি। স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে আশপাশের এলাকায় অনুসন্ধান চালান। মসজিদের মাইকে বারবার ঘোষণা দেওয়া হয়। নিকুঞ্জ ও খিলক্ষেতের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক গ্রুপে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রচার করা হয় মাহাদীর ছবি ও পরিচয়। এলাকার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থান এবং বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীরাও শিশুটির খোঁজে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

একটি শিশুকে ঘিরে এমন মানবিক উদ্যোগে যেন পুরো এলাকাই এক পরিবারের রূপ নিয়েছিল। সবাই বিশ্বাস করছিলেন, হয়তো কোনো অলৌকিকভাবে মাহাদী ফিরে আসবে তার মায়ের কোলে।

কিন্তু বুধবার সকালে সেই আশার প্রদীপ নিভে যায়।

নিকুঞ্জ-১ এর খেলার মাঠ সংলগ্ন জামতলা এলাকার একটি উন্মুক্ত জলাশয়ে মাহাদীর মরদেহ পাওয়া যায়। খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন শত শত মানুষ। স্বজনদের আহাজারি আর এলাকাবাসীর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।

স্থানীয়দের অনেকেই দাবি করেন, ঘটনাস্থলের পরিবেশ এবং শিশুটির শারীরিক অবস্থা দেখে তাদের সন্দেহ হচ্ছে, এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়। কেউ বা কারা মাহাদীকে হত্যার পর জলাশয়ে ফেলে দিয়ে থাকতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে রাজি নয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এ ব্যাপারে এলাকার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির আহ্বায়ক জাহিদ ইকবাল বলেন, “গত একদিন ধরে মাহাদী শুধু একটি পরিবারের সন্তান ছিল না, সে পুরো এলাকার সন্তানে পরিণত হয়েছিল। তার সন্ধানে মানুষ যেভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে, যেভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালিয়েছে, যেভাবে মসজিদের মাইকে বারবার ঘোষণা হয়েছে—তা আমাদের সমাজের মানবিক চেহারাটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। সবাই চেয়েছিল ছোট্ট শিশুটি নিরাপদে ফিরে আসুক।”

তিনি বলেন, “আজ যখন মাহাদীর মৃত্যুর খবর শুনলাম, তখন সত্যিই ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। একজন সাংবাদিক হিসেবে বহু মর্মান্তিক ঘটনা দেখেছি, কিন্তু একটি নিষ্পাপ শিশুকে ঘিরে মানুষের এত আশা-ভরসার পর এমন পরিণতি হৃদয়কে ভেঙে দেয়। মাহাদীর মায়ের বুকফাটা কান্না, বাবার নির্বাক বেদনা এবং স্বজনদের আহাজারি দেখে নিজেকেও সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। আমি বারবার শুধু ভাবছিলাম—যে শিশুটিকে খুঁজে পেতে হাজারো মানুষ প্রার্থনা করেছে, সে কেন এভাবে চলে গেল? আমরা চাই ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হোক। যদি এর পেছনে কোনো অপরাধ থেকে থাকে, তবে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।”

গত একদিন ধরে মাহাদীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিকুঞ্জ, টানপাড়া ও খিলক্ষেত এলাকার মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। একটি শিশুর সন্ধানে মানুষের যে ভালোবাসা, উদ্বেগ ও মানবিক সংহতি দেখা গেছে, তা ছিল বিরল। কিন্তু সেই গল্পের সমাপ্তি হলো গভীর শোকের মধ্য দিয়ে।

যে মাহাদীর হাসিতে মুখর থাকার কথা ছিল একটি ঘর, সে আজ নিথর। যে মা সন্তানের ফিরে আসার আশায় বারবার দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তার বুক আজ শোকে বিদীর্ণ। যে বাবা সন্তানের খোঁজে ছুটে বেড়িয়েছেন এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, তিনি আজ নির্বাক। আর পুরো নিকুঞ্জ-খিলক্ষেতবাসীর হৃদয়ে আজ একটাই প্রশ্ন—কেন এভাবে থেমে গেল ছোট্ট মাহাদীর জীবন?

এলাকাবাসীর দাবি, এই ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা হোক। কারণ মাহাদীর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, এটি সমগ্র সমাজের বিবেককে নাড়া দেওয়া এক বেদনাদায়ক ঘটনা।

এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) সোহরাব আল হোসাইন বলেন, “ঘটনার সব দিক গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। মরদেহ উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে।”

টিএ/

মন্তব্য করুন