© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

মহাকাশে কোরআন তিলাওয়াতকারী প্রথম আফগান নভোচারী আর নেই

শেয়ার করুন:
মহাকাশে কোরআন তিলাওয়াতকারী প্রথম আফগান নভোচারী আর নেই

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৩:৫৮ পিএম | ২৮ জুন, ২০২৬
জার্মানির স্টুটগার্ট শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন আফগানিস্তানের এই বীর সন্তান। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তার এই প্রয়াণে বিশ্বজুড়ে মহাকাশপ্রেমী ও আফগান সম্প্রদায়ের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

আবদুল আহাদ মোমান্ডের জন্ম ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি আফগানিস্তানের গজনি প্রদেশে। তরুণ বয়সেই তিনি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে সামরিক বিমান চালনার ওপর উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে তিনি আফগান বিমান বাহিনীতে যুদ্ধবিমানচালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং তাঁর মেধা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে দ্রুতই পাইলট হিসেবে সুনামের অধিকারী হন।

১৯৮৮ সালটি ছিল তার জীবনের এবং সমগ্র আফগানিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। ওই বছরের ২৯ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের সয়ুজ টিএম-৬ মহাকাশযানে চড়ে তিনি পৃথিবীর কক্ষপথের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এই অভিযানের মাধ্যমে তিনি বিশ্বের দরবারে প্রথম আফগান মহাকাশচারী হিসেবে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখেন। 

মহাকাশে অবস্থানকালে তিনি মীর স্পেস স্টেশনে অবস্থান করেন এবং ৯ দিন মহাকাশে কাটিয়ে ৭ সেপ্টেম্বর পৃথিবীতে সফলভাবে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁর এই ঐতিহাসিক মহাকাশযাত্রা কেবল আফগানিস্তানের জন্যই নয়, বরং তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের জন্যও ছিল এক বিরাট গৌরবের বিষয়।
 
মহাকাশ অভিযানের সময় আবদুল আহাদ মোমান্ডের বেশ কিছু অনন্য কর্মকাণ্ড ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। তিনি গভীর শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে মহাকাশে নিজের সঙ্গে পবিত্র কোরআনের একটি কপি নিয়ে গিয়েছিলেন। মহাকাশ স্টেশন থেকে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে কোরআন তিলাওয়াত করার গৌরব অর্জন করেন তিনি। 

একই সঙ্গে মহাকাশ থেকে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে নিজের মাতৃভাষা 'পশতু'তে কথা বলে এক অনন্য রেকর্ড তৈরি করেন, যা বিশ্বজুড়ে আফগান সংস্কৃতির এক শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল। মহাকাশে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি আফগানিস্তানের ভূপ্রাকৃতিক ও পরিবেশগত নানা ছবি তোলেন এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অংশ নেন।
 
তৎকালীন ভূরাজনীতিতে তাঁর এই অভিযানের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ১৯৮৮ সালে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিক সেই মুহূর্তে মোমান্ডের এই মহাকাশযাত্রাকে দুই দেশের মধ্যকার বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এই ঘটনাটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের সম্ভাবনাকে তুলে ধরে।
 
তবে সময়ের আবর্তে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও গৃহযুদ্ধের কারণে এই মহানায়কের অবদান অনেকটাই আড়ালে চলে যায়।নব্বইয়ের দশকে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তিনি সপরিবারে জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে বাধ্য হন এবং জীবনের বাকি সময় প্রবাসেই কাটিয়ে দেন। বর্তমান তালেবান শাসিত আফগানিস্তানের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের প্রথম এই মহাকাশচারীর ঐতিহাসিক অর্জনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে খুব বেশি স্মরণ বা আলোচনা করা হয় না।
 
রাজনৈতিক পটভূমি যা-ই হোক না কেন, আবদুল আহাদ মোমান্ডের নাম আফগান জাতির ইতিহাসে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং মহাকাশ অভিযানের এক চিরউজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবে। প্রতিকূলতার মাঝেও আকাশ ছোঁয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছেন, তা আগামী প্রজন্মের আফগান তরুণদের জন্য সর্বদা অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে।

এমআর/টিএ   

মন্তব্য করুন