© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ, কেন বারবার বিতর্কে ইনফ্যান্তিনো?

শেয়ার করুন:
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ, কেন বারবার বিতর্কে ইনফ্যান্তিনো?

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৫:২৮ পিএম | ০৮ জুলাই, ২০২৬
বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো। ২০১৬ সালে দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে বিপর্যস্ত ফিফার দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাকে দেখা হয়েছিল পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে। প্রায় এক দশক পর তিনি বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হলেও, তার নেতৃত্ব এখন সমানভাবে প্রশংসা ও বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।

চলমান বিশ্বকাপে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ইনফ্যান্তিনো। যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড় ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড স্থগিতের ঘটনা, ব্যক্তিগত জেটে এক ভেন্যু থেকে অন্য ভেন্যুতে যাতায়াত এবং রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে তাকে ঘিরে সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে। এমনকি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৩৫ জন সদস্য তার কর্মকাণ্ড তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন।

দুর্নীতিগ্রস্ত ফিফা থেকে নতুন যাত্রা

২০১৫ সালে ফিফার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্নীতিকাণ্ড প্রকাশ্যে আসার পর পদচ্যুত হন দীর্ঘদিনের সভাপতি সেপ ব্ল্যাটার। সেই সংকটের মধ্যেই ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ফিফার দায়িত্ব নেন সুইস-ইতালীয় আইনজীবী জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো।

দায়িত্ব নেওয়ার সময় তার প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল ফিফার স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, সদস্য দেশগুলোর উন্নয়ন তহবিল বাড়ানো এবং বিশ্বকাপকে আরও বিস্তৃত করা।

তিনবার নির্বাচিত, আবারও প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা

২০১৬ সালের পর ২০১৯ ও ২০২৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবারও ফিফা সভাপতি নির্বাচিত হন ইনফ্যান্তিনো। ২০২৭ সালের নির্বাচনেও প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি। ফিফার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তার বর্তমান মেয়াদ ২০১৯ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণনা হওয়ায় আরও একটি পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ রয়েছে।

বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, সমালোচনার কেন্দ্রে

ইনফ্যান্তিনোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বহুবার প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষ করে ট্রাম্পের সম্মানে ফিফা পিস প্রাইজ চালুর ঘোষণা এবং ২০২৬ বিশ্বকাপের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

২০৩৪ বিশ্বকাপ নিয়েও প্রশ্ন

২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব সৌদি আরবকে দেওয়ার প্রক্রিয়াও সমালোচনার মুখে পড়ে।

ফিফা এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যেই বিড সীমাবদ্ধ রাখায় শেষ পর্যন্ত সৌদি আরব একমাত্র প্রার্থী হিসেবে থেকে যায় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আয়োজক নির্বাচিত হয়।

সমালোচনার পাশাপাশি সাফল্যও কম নয়

বিতর্ক থাকলেও ইনফ্যান্তিনোর নেতৃত্বে ফিফার আর্থিক অবস্থার বড় পরিবর্তন এসেছে।

তার দায়িত্বকালে সদস্য দেশগুলোর উন্নয়ন তহবিল প্রায় আট গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে ফুটবল উন্নয়নে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে ফিফা।

২০১৬ সালে ফিফার বার্ষিক আয় যেখানে ছিল প্রায় ৫০ কোটি ডলার, বর্তমানে তা বেড়ে ২৬০ কোটিরও বেশি ডলারে পৌঁছেছে। ৪৮ দলের বিশ্বকাপ চালুর মাধ্যমে আরও বড় রাজস্ব অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে সংস্থাটি।

এছাড়া আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সদস্য দেশগুলোর হিসাব নিয়মিত নিরীক্ষা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে নতুন নীতিমালাও চালু করেছেন তিনি।

শৈশবের সংগ্রাম থেকে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে

১৯৭০ সালে সুইজারল্যান্ডে ইতালীয় অভিবাসী পরিবারে জন্ম ইনফ্যান্তিনোর। ছোটবেলায় বর্ণবাদ ও বৈষম্যের অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

ফ্রিবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি ফুটবল প্রশাসনে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি সুইজারল্যান্ড, ইতালি ও লেবাননের নাগরিক এবং সাতটি ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন।

প্রচারণাপ্রিয় নেতৃত্বও প্রশ্নের মুখে

ইনফ্যান্তিনো নিজেকে একজন দক্ষ 'সেলসম্যান' হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। ক্লাব বিশ্বকাপের প্রচারে ট্রাম্পের অফিসে ট্রফি প্রদর্শন থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ সম্প্রসারণ—সব ক্ষেত্রেই প্রচারণাকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

তবে সমালোচকদের মতে, অতিরিক্ত প্রচারণা ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কারণে অনেক সময় ফুটবলের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

প্রশংসা নাকি বিতর্ক—কোনটি বেশি?

ফিফার ইতিহাসে ইনফ্যান্তিনোর সময়কে একদিকে আর্থিক সাফল্য ও বিশ্বকাপ সম্প্রসারণের যুগ হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাব, বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের অভিযোগও সমানভাবে উঠে এসেছে।

ফলে ১০ বছর পরও জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোকে ঘিরে প্রশ্ন একই রয়ে গেছে—তিনি কি বিশ্ব ফুটবলের সফল সংস্কারক, নাকি বিতর্কের মধ্যেও নিজের ক্ষমতার পরিধি বাড়িয়ে চলা এক প্রভাবশালী প্রশাসক?

এসএন 

মন্তব্য করুন