জুলাই শহীদ দিবসে ভাঙা দল নিয়েও বাজিমাত কংগ্রেস নেত্রী মমতার
ছবি: সংগৃহীত
০৮:০৩ পিএম | ২১ জুলাই, ২০২৬
ক্ষমতায় থাকাকালীন বছরের সব থেকে বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে একুশে জুলাই শহিদ দিবসকে বেছে নিতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ছিল প্রথম শহিদ দিবস। এবারের শহিদ দিবস এমন এক পরিস্থিতিতে এসে পড়েছে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস তিন শিবিরে বিভক্ত। যেখানে তিন শিবিরেরই দাবি শহিদ দিবস আদতে তাদের। দিনটির ট্রেডমার্ক নিজেদের করে নিতে প্রত্যেকে শিবির আলাদা আলাদাভাবে পালন করেছে শহিদ দিবস। আবার জাতীয় কংগ্রেসও কলকাতার শহিদ মিনার চত্বরে শহিদ দিবস পালন করে চমক দেয়ার চেষ্টা করেছে। তবে ভিড়ের নিরিখে কংগ্রেসসহ তৃণমূল কংগ্রেসের বিভিন্ন শিবিরকে টেক্কা দিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমাবেশ।
ভোটে ভরাডুবির পর একুশে জুলাই আক্ষরিক অর্থেই অন্যরকম। প্রত্যেক বছর গোটা রাজ্য থেকে ট্রেনে চড়ে তৃণমূলের কর্মী সমর্থকরা কলকাতার সমাবেশে যোগ দিতে আসেন। হাওড়া স্টেশনে থাকে উপচে পড়া ভিড়। তবে এবার সেই ছবি উধাও। কার্যত খাঁ খাঁ করছে হাওড়া স্টেশন ও ফেরিঘাট চত্বর। নেই তৃণমূলের কোনো ফেস্টুন, ব্যানার বা পতাকা। বাজছে না লাউড স্পিকার। কর্মী সমর্থকদের স্বাগত জানাতে কোনো মঞ্চও তৈরি করা হয়নি। ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষের উপস্থিতি যে শহিদ দিবসের একটা স্বাভাবিক বিষয় সেখানে কলকাতার তিন সভায় সব মিলিয়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষেরও উপস্থিতি ছিল না এদিন।
কলকাতা হাইকোর্টের অনুমতি নিয়ে বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে একুশে জুলাইয়ের সমাবেশ করছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কালীঘাট-তৃণমূল’। দুপুর ১২টা থেকে শুরু হয় সমাবেশ। ভাঙা দল নিয়েও ভিড়ের ঠাসা সভায় কংগ্রেস বা ঋতব্রত তৃণমূলের তুলনায় চমক ছিল তারামণ্ডল চত্বরে মমতার সভায়।
কালীঘাট তৃণমূলের মঞ্চে ছিলেন অভিষেক ব্যানার্জি, কীর্তি আজাদ, বাবুল সুপ্রিয়, শোভনদেব চ্যাটার্জি, রাজীব কুমার, সাগরিকা ঘোষ, কল্যাণ ব্যানার্জি, প্রতিমা মণ্ডল, বিমান ব্যানার্জি, সৌগত রায়, মহুয়া মৈত্র, অশোক দেব, গৌতম দেব। এদিনর সভায় থেকে বিজেপির বিরুদ্ধে কঠিন লড়াইয়ের ঘোষণা দেন মমতা।
জাতীয় ও রাজ্য স্তরে বিজেপি বিরোধিতার বৃহত্তর মঞ্চ হিসেবে এদিন আবারও ইন্ডিয়া জোটকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেন তিনি। বলেন, ‘আমার কোনো ছুঁৎমার্গ নেই। ইন্ডিয়া জোট নিয়ে একসঙ্গে চলব। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে চাইলে একসঙ্গে আসুন।’ রাজনীতির মূল স্রোতে ফিরতে মমতা বলেন, ‘আগামী দিনে বাংলায় জোট করব, ইন্ডিয়া জোট একসঙ্গে চলব। শুরু করলে শেষ করব না।’ এ সময় জেলায় জেলায় আন্দোলন কর্মসূচি গড়ে তুলতে প্রত্যেক জেলায় যাওয়ার ঘোষণাও দেন তিনি।
২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে ককরোচ জনতা পার্টিকেও সমর্থনের ডাক দেন মমতা। বিজেপিকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘দিল্লিতে দেখুন, ছাত্র-যুবদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে। যে বেইমানি করবে তাকে সমর্থন করার দরকার নেই। দরকার হলে ককরোচ জনতা পার্টির কর্মসূচিতে আমি নিজে যাব।’
মমতা বলেন, ‘দেশ শেষ হয়ে গিয়েছে, অর্থনীতিতে ধস, শিক্ষানীতিতে ধস। যারা আত্মহত্যা করছে, তাদের জীবনটা ফিরিয়ে দিতে পারবেন? বুলডোজার সরকার, হকারদের জীবন জীবিকা কাড়ছে। মিড ডে মিলের কর্মীদের চাকরি যাচ্ছে। মা লক্ষ্মীরা কেঁদে বেড়াচ্ছে।’
এ সময় বিরোধী শিবির ও বিজেপির উদ্দেশে দলের প্রতীকের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা প্রসঙ্গে মমতা বলেন, ‘তুমি প্রতীক কাড়লে, আমি ছাড়ব না। আমাদের প্রতীক কাড়তে পারে না। গায়ের জোরে করছে। আমি সুপ্রিম কোর্ট অবধি যাব। আর নাহলে আমি তোমাদেরও সবটা কেড়ে নেব।’
মমতা বলেন, ‘আগে তো আমরা দু’জন এমপি ছিলাম। এখন তো ১৬-১৭ জন আছে। কোনো চিন্তা নেই। ফসল কাটা শেষ হয়নি। সাহস থাকলে আমার সঙ্গে থাকবেন। নাহলে বিজেপির স্পনসরড টিমের সাথে না থেকে সরাসরি বিজেপিতে চলে যাবেন। যত যাবেন খুশি হব। যে স্থান শূন্য হবে, তা পূরণের জন্য আমার ছাত্র, যুবক আছে।’
৩২ বছর আগে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই, নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার জন্য, সচিত্র পরিচয়পত্রের যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা কর্মসূচি ঘিরে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছিল কলকাতার ধর্মতলা চত্বর। অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয় মেয়ো রোড-রেড রোডের মোড়ে। বোমাও পড়ে। পুলিশের ভ্যানে অগ্নি সংযোগের মতো ঘটনাও ঘটে। বিক্ষোভকারীরা সচিবালয় মহাকরণের উদ্দেশ্যে এগোতে শুরু করলে গুলি চালাতে শুরু করে পুলিশ। আর তাতেই প্রাণ যায় ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মীর।
এরপর থেকে কংগ্রেসের ব্যানারেই মমতা প্রতিবছর শুরু করেন ২১ জুলাই শহিদ দিবস পালন। ১৯৯৯-তে কংগ্রেসকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে নতুন দল গড়েন মমতা। দখল করেন কংগ্রেসের ২১ জুলাই। এরপর থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যানারেই চলতে থাকে শহিদ দিবস। ২০১১-তে বাম বিদায়ের পর রাজ্যের ক্ষমতায় এলে মমতার দল উৎসবের আবহে বৃহৎ পরিসরে রাজ্যে শুরু করে শহিদ দিবস পালন। কিন্তু ২০২৬-এ ক্ষমতা থেকে বিদায়ে মমতার থেকে কার্যত বেহাত হওয়ার অবস্থায় জুলাই।
আরআই/টিএ