মোদির ওপর চাপ বাড়ছে: রয়টার্স
ছবি: সংগৃহীত
০৭:০২ পিএম | ২২ জুলাই, ২০২৬
প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে শুরু হওয়া বিক্ষোভের জেরে শেষ পর্যন্ত ভারতের সংসদ অধিবেশন স্থগিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। টানা কয়েক দিনের বিক্ষোভে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওপর চাপ বাড়ছে।
বুধবার (২২ জুলাই) ব্রিটিশভিত্তিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়,মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত মাসে ভারতে এই প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল, যার কারণে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চলতি সপ্তাহে এই আন্দোলন ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর তার বিরুদ্ধে তরুণ সমাজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে।
এরই রেশ ধরে বুধবার ভারতের পার্লামেন্টে বিরোধী দলগুলো শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করে। তারা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে এই দাবি তোলে। পরে তারা সংসদ কক্ষে প্রবেশ করলে হট্টগোলের কারণে অধিবেশন স্থগিত করতে হয়।
এর আগে সোমবার (২০ জুলাই) কয়েক দশক হাজার তরুণ বিক্ষোভকারী নয়াদিল্লির রাজপথে নেমে আসেন। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে, এ সময় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়।
বুধবার নয়াদিল্লিতে পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা বিক্ষোভে অংশ নেন। তাদের অনেকেই কালো পোশাক পরেছিলেন এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে প্ল্যাকার্ড বহন করছিলেন।
প্ল্যাকার্ডগুলোতে লেখা ছিল, ‘আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ বিক্রির জন্য নয়’ এবং ‘জীবন বাঁচান, নিট (NEET) বন্ধ করুন’। এখানে মেডিকেল কলেজে ভর্তির জাতীয় যোগ্যতা ও প্রবেশিকা পরীক্ষার (NEET) কথা উল্লেখ করা হয়। বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিরুদ্ধেও স্লোগান দেন।
পরে সংসদ কক্ষে প্রবেশের পর বিরোধী আইনপ্রণেতারা শিক্ষার্থী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের কথিত সহিংসতা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ নিয়ে আলোচনার দাবি জানান। এতে সংসদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায়। তবে মোদি ও প্রধান জানিয়েছেন, তারা এ বিষয় এবং শিক্ষা খাতে বৃহত্তর সংস্কার নিয়ে সংসদে আলোচনায় প্রস্তুত।
মঙ্গলবার রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের প্রবেশপথের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে। বিক্ষোভ প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানালে পুলিশ রাহুল গান্ধী, তার বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রা এবং বিরোধী দলের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে আটক করে। তবে মঙ্গলবার রাতেই তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।
নিজেদের ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামে পরিচয় দেয়া এই আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে। শুরুতে এতে মাত্র কয়েক শ তরুণ অংশ নিয়েছিলেন।
বুধবার দিল্লির যন্তর-মন্তরের সিজেপির বিক্ষোভস্থলে এক হাজারের বেশি আন্দোলনকারী জড়ো হন। তারা স্লোগান দেন, ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়ান এবং গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে অবস্থান চালিয়ে যান। সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সোমবারের পর সিজেপি নেতাদের সঙ্গে সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর দ্বিতীয় দফা বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।
এ দিকে রাজধানী দিল্লিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর রাখা হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত শহরের কেন্দ্রস্থলের ১৬টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন।
বিক্ষোভ রাজধানী দিল্লির গণ্ডি পেরিয়ে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, কলকাতা, গোয়া, গৌহাটি, তিরুবনন্তপুরম, জম্মু ও আহমেদাবাদে তরুণ ও বিরোধী দলগুলোর উদ্যোগে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার গভীর রাতে পদত্যাগের দাবি ওঠার পর প্রথমবারের মতো মুখ খোলেন দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তিনি বলেন, আন্দোলনরত তরুণদের উদ্বেগ দূর করা এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এক্সে (সাবেক টুইটার) দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমাদের সরকার সংসদে নিট (NEET) নিয়ে আলোচনা এবং আমাদের তরুণদের প্রতিটি যৌক্তিক উদ্বেগের সমাধানে শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
রাহুল গান্ধীর বিক্ষোভের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘ভারতের শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার চেয়ে অনেক ভালো আচরণ তাদের প্রাপ্য।’
৫৭ বছর বয়সী ধর্মেন্দ্র প্রধান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একজন জ্যেষ্ঠ নেতা। তিনি দলটির উদীয়মান নেতাদের একজন হিসেবে পরিচিত এবং অতীতে বিজেপির নেতৃত্ব দেয়ার সম্ভাব্য ব্যক্তিদের তালিকাতেও তার নাম উঠে এসেছিল।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই ধর্মেন্দ্র প্রধান মন্ত্রিসভার সদস্য। তিনি পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস, ইস্পাত, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালে তিনি শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার বাবা-ও বিজেপির একজন প্রবীণ নেতা ছিলেন এবং ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মোদি বা বিজেপি এখন পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবির বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দলটির কাছে তার গুরুত্বেরই ইঙ্গিত বহন করে।
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়া তরুণ ভারতীয়দের মধ্যে চাকরির সংকট এবং ঘন ঘন প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ইস্যুতে জমে থাকা ক্ষোভের প্রতিফলন। আন্দোলনকারীদের দাবি, এ ধরনের প্রশ্নফাঁস প্রায়ই ঘটে।
এই আন্দোলন বিরোধী দলগুলোর জন্যও মোদি ও বিজেপির ওপর চাপ বাড়ানোর একটি বিরল সুযোগ তৈরি করেছে। তরুণ ভোটাররা বিজেপির অন্যতম প্রধান সমর্থকগোষ্ঠী এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলেও এরপর দলটি একাধিক রাজ্যের নির্বাচনে জয় পেয়েছে।
২৮ জুন অনশন শুরু করা অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সমর্থন পাওয়ার পর সিজেপি আন্দোলন আরও গতি পায়। তবে শনিবার পুলিশ তাকে জোর করে একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়।
মঙ্গলবার তার স্ত্রীর করা আবেদনের পর আদালতের নির্দেশে ওয়াংচুককে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছিল, তাকে অবৈধভাবে আটক করে রাখা হয়েছিল।
পরামর্শক সংস্থা টিএস লম্বার্ডের প্রধান ভারতবিষয়ক অর্থনীতিবিদ শুমিতা দেবেশ্বর বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে চলা এই বিক্ষোভ মোদি সরকারের জন্য আরও বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জে রূপ নিতে পারে। কারণ এটি এমন এক তরুণ ও ক্রমবর্ধমান কর্মশক্তির গভীর ক্ষোভকে সামনে এনেছে, যারা চাকরি খুঁজে পেতে সংগ্রাম করছে।’
আরআই/টিএ