বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ছাত্র-আন্দোলনের উত্তাপ এবার ভারতে। নিজেদের ন্যায্য দাবি আদায়ে দেশটির বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীরা শুরু করেছেন আন্দোলন। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর ব্যানারে সংগঠিত এ আন্দোলনের সূচনা হয় NEET মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বারবার ফাঁস হওয়ার প্রতিবাদে। পরে এটি শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।
এ আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে ভারতের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবিদ সোনম ওয়াংচুক দীর্ঘ ২৬ দিন অনশনের পর গতকাল সেটা ভেঙেছেন। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে সংহিস দমন-পীড়নের মাধ্যমে আন্দোলন রুখে দিতে চাইছেন। যদিও তিনি গতকাল কেন্দ্রীয় শিক্ষা সচিবকে সরিয়ে দিয়ে অভিযুক্তদের বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। তথাপিও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এ আন্দোলনে ছাত্রদের প্রতি গণমানুষের পাশাপাশি সমর্থন জানিয়েছেন ভারতের বিনোদন অঙ্গনের আলিয়া ভাট, সালমান খান, সারা আলি খান, কারিনা কাপুরসহ বলিউডের তারকারা। ২০ জুলাই পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করার পর থেকে প্রতিদিনই বলিউডের আরও অনেক তারকা এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন।
* যেসব তারকা সরাসরি আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন
প্রখ্যাত অভিনেত্রী শাবানা আজমি দক্ষিণের জনপ্রিয় অভিনেতা প্রকাশ রাজের সঙ্গে মিছিলে অংশ নিয়ে ঘটনাস্থলেই সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই এখানে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে এসেছি, আমাদের দেশের সংবিধান যে অধিকার দিয়েছে তা প্রয়োগ করতেই এসেছি। মহাত্মা গান্ধী আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে হয়, আর আমরা সেই আদর্শ নিয়েই এখানে এসেছি।’
হুমা কুরেশি ও তার ভাই সাকিব সালিম বৃহস্পতিবার ভোরে যন্তর মন্তরে যান। হুমা বলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যে ধরনের বলপ্রয়োগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তা তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।
অমল পারাশর কাউকে আগে না জানিয়ে নীরবে ‘চলো সংসদ’ মিছিলে অংশ নেন। পরে তিনি লেখেন, তিনি সেখানে গিয়েছিলেন ‘শুধু একজন সহনাগরিক হিসাবে’ ছাত্রদের পাশে দাঁড়াতে।
ইমরান খান মুম্বাইয়ে সংহতি মিছিলে অংশ নিয়ে বলেন, শিল্পীদের উচিত নয় তাদের কাজকে তাদের নৈতিক বিশ্বাস থেকে আলাদা করা।
অভিনেত্রী আয়েশা খান জানান, সংহতি মিছিলে যাওয়ার পথে তাকে মুম্বাই পুলিশ আটক করেছিল। সমালোচকদের জবাবে পরে তিনি লেখেন, ‘আমার মেরুদণ্ড হারানোর চেয়ে ক্যারিয়ার হারানোই ভালো।’
* সোনম ওয়াংচুকের অনশনকে সমর্থন জানানো তারকারা
প্রীতি জিনতা এক্স (সাবেক টুইটার)-এ সরাসরি সোনম ওয়াংচুককে উদ্দেশ্য করে লেখেন, ‘আমি আশা করি আমাদের সরকার সোনম ওয়াংচুক এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে অর্থবহ সংলাপ শুরু করবে, যাতে তার স্বাস্থ্যের আরও অবনতি না হয়। দয়া করে অনশন ভাঙুন, সোনম। আপনার স্বাস্থ্যও এই আন্দোলনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।’ পরদিন তিনি আবার লেখেন, এ আন্দোলন যেন বাইরের কোনো স্বার্থগোষ্ঠীর দ্বারা ‘ছিনতাই’ না হয়।
আমির খানও জানিয়েছেন প্রতিবাদ। তবে তিনি ‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমায় তার চরিত্রটি সোনম ওয়াংচুককে ভিত্তি করে তৈরি নয় বলে জানান। অভিনেতা বলেন, ‘মি. সোনম যে কাজ করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তাকে সম্মান জানাতে তার থ্রি ইডিয়টস-এর কোনো চরিত্রের ভিত্তি হওয়ার প্রয়োজন নেই।’
* সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা আন্দোলনের পক্ষে কথা বলেছেন
আলিয়া ভাট লেখেন, ‘গত কয়েক দিন আমার হৃদয় ভেঙে দিয়েছে, আবার বারবার আশার আলো দেখিয়ে সেটিকে জুড়েও দিয়েছে। নিজের অবস্থানে অটল প্রতিটি ছাত্রের পেছনে রয়েছে একটি স্বপ্ন, একটি পরিবারের আশা এবং অসংখ্য ত্যাগের গল্প।’
সালমান খান নিজের শৈশবের একটি ছবি শেয়ার করে লেখেন, ‘এটি ছিল অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ একটি আন্দোলন। এটি সহিংস মোড় নিয়েছে জেনে খুব কষ্ট লাগছে। আহত ছাত্রছাত্রী ও তাদের পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা।’
সোনাক্ষী সিনহা আহত আন্দোলনকারীদের ছবি পোস্ট করে লেখেন, ‘২০ জুলাই, অনেক মানুষের হাড় ভেঙেছে, আর একটি পুরো দেশের হৃদয় ভেঙেছে। এটা মনে রেখ।’
সারা আলি খান লেখেন, ‘আমাদের ছাত্রছাত্রীরাই আমাদের ভবিষ্যৎ, আর তাদের ভবিষ্যৎ আমাদের জাতির হৃদয়কে স্পর্শ করে। তাদের দৃঢ় সংকল্প এক নীরব অথচ অদম্য শিখার মতো, যা আমার চোখে জল এনে দেয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, সত্যিকারের দেশপ্রেম তাদের হৃদয়েই স্পন্দিত হয়, যারা নিজেদের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস রাখে। একজন আশাবাদী দেশপ্রেমিক হিসাবে আমার বিশ্বাস, সরকার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে।’
অনন্যা পান্ডে লেখেন, ‘জেন-জি প্রজন্মকে নানা নামে ডাকা হয়েছে, যার অনেকগুলোই ইতিবাচক নয়। কিন্তু হয়তো এ মুহূর্ত আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, এ প্রজন্ম আসলে কারা। তারা শর্টকাট চায় না, তারা শুধু ন্যায্যতাকে ব্যতিক্রম নয়, ন্যূনতম মানদণ্ড হিসাবে দেখতে চায়। প্রশ্ন করা অসম্মান নয়। নিজের কথা বলা বিদ্রোহ নয়। এটি আশার প্রকাশ।’
কারিনা কাপুর লেখেন, ‘এত তরুণ মানুষের কণ্ঠস্বর, তাদের উপেক্ষা করা অসম্ভব, আর করা উচিতও নয়। তারা এমন একটি ব্যবস্থার যোগ্য, যার ওপর তারা আস্থা রাখতে পারে; যেখানে মেধার প্রকৃত মূল্য থাকবে, পরিশ্রমের স্বীকৃতি মিলবে এবং প্রতিটি শিশুর শুরু হবে সমান সুযোগ নিয়ে। এটি খুব বেশি কিছু চাওয়া নয়, বরং ন্যূনতম প্রত্যাশা। তারা শুধু আগামী দিনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে না, তারাই আগামী দিন।’
বরুণ ধাওয়ান লেখেন, ‘ছাত্রছাত্রীরাই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ। একজন ছাত্রের স্বপ্ন ভেঙে গেলে শুধু একটি স্বপ্ন নয়, একটি পুরো পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যায়। আমি কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই, তারা যেন এসব উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন এবং একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও অর্থবহ সমাধানের পথে এগিয়ে যান, যাতে জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।’
টুইঙ্কল খান্না দিল্লি ও মুম্বাইয়ের আন্দোলনের ছবি শেয়ার করেন। এর মধ্যে ছিল ২৭ বছর বয়সি মডেল রিয়া আহিরের ছবিও, যিনি আটক আন্দোলনকারীদের বহনকারী একটি পুলিশ ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। টুইঙ্কল লেখেন, ‘আমি এমন একটি দেশের নাগরিক হতে পেরে গর্বিত, যেখানে আমাদের তরুণরা এখনো ভিন্নমত প্রকাশের সাহস রাখে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, টিয়ার গ্যাস ও লাঠির মুখোমুখি হয়। দুঃখের বিষয় হলো, তাদের এমনটা করতে হচ্ছে।’
নাসিরুদ্দিন শাহ একটি ভিডিও বার্তায় আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ছাত্রদের প্রতি দেখানো নিষ্ঠুরতা দেখে তার হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে গেছে এবং তিনি ক্ষোভে ফুঁসছেন।
দিলজিৎ দোসাঞ্জ বলেন, ছাত্রদের সঙ্গে এমন আচরণ করা উচিত ছিল না। কৃষক আন্দোলনের সময় তিনি যে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন, সেটির উল্লেখ করে বলেন, এবারও তিনি কথা বলার জন্য ‘দেশবিরোধী’ আখ্যা পাবেন বলেই আশা করছেন।
রিতেশ দেশমুখ ও জেনেলিয়া দেশমুখ যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘তরুণদের কণ্ঠস্বর জোরালোভাবে, স্পষ্টভাবে এবং নির্ভয়ে শোনা উচিত।’ তারা আরও বলেন, ছাত্রছাত্রীরাই গণতন্ত্রের প্রাণস্পন্দন।
সোহা আলি খান লিখেছেন, ‘ভবিষ্যৎ তরুণদের।’ তিনি প্রত্যেক তরুণ-তরুণীর জন্য প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার সুযোগ কামনা করেন।
অভিনেত্রী রেভতী আশা আরও তীক্ষ্ণ ঐতিহাসিক তুলনা টেনে লেখেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে পুলিশের ‘সহিংসতা চালানো’ তাকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দমন-পীড়নের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। রোহিত সারাফ দিনটিকে ‘হৃদয়বিদারক’ বলে উল্লেখ করেন। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ দিনটি সহিংসতার জন্য নয়, বরং শিক্ষার্থীদের সাহসিকতার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সোনাক্ষী সিনহা, নাসিরুদ্দিন শাহ, রত্না পাঠক শাহ, সোহা আলি খান, রোহিত সারাফ, রিতেশ ও জেনেলিয়া দেশমুখ, পূজা ভাট, আদিতি রাও হায়দারি, নেহাল চৌদাসামা, ভূমি পেডনেকর, দিয়া মির্জা, সোনম বাজওয়া, সোনু সৌদ, বিশাল দাদলানি, জাভেদ আখতার, রাজকুমার রাও, অনুপম খের, অনুরাগ কাশ্যপ, আর. মাধবন, স্বরা ভাস্কর, বীর দাস, রেভতী আশা, থালাপতি বিজয় এবং চিন্ময়ী শ্রীপদা-সবাই বিভিন্নভাবে নিজেদের সমর্থন প্রকাশ করেছেন। কেউ ইনস্টাগ্রামে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে পোস্ট করেছেন, আবার কেউ সরাসরি শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন।
* আরও সমালোচনামূলক বা মিশ্র প্রতিক্রিয়া
সবাই অবশ্য আন্দোলনকারীদের সমর্থন করেননি। রূপালি গাঙ্গুলি লিখেছেন, ‘যারা পুলিশের ওপর হামলা করে, তাদের ছাত্র বলা যায় না।’ অন্যদিকে দেবলীনা ভট্টাচার্য আন্দোলনের বৈধতাই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। দুলকার সালমান সহিংসতাকে ‘হৃদয়বিদারক’ বলে আখ্যা দিলেও একইসঙ্গে এ নিয়ে তার আলাদা উদ্বেগের কথাও তুলে ধরেছেন।
* যারা এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে নীরব
এ প্রতিবেদন প্রকাশ (গতকাল রাত ৮টা) পর্যন্ত শাহরুখ খান, রণবীর কাপুর, দীপিকা পাড়ুকোন, অক্ষয় কুমার এবং অজয় দেবগনের মতো তারকারা এ বিষয়ে কোনো প্রকাশ্য বিবৃতি দেননি। তবে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই যে কোনো সময় তাদের অবস্থান বদলাতে পারে।
এসএ/টিএ