হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি: প্রধানমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
০৭:১০ পিএম | ০৪ আগস্ট, ২০২৬
দুই বছর আগে গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের দিনটিকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিন হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফ্যাসিবাদ পতনের আন্দোলনে অংশ নিয়ে হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
আগামীকাল বুধবার (৪ আগস্ট) ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া আজ মঙ্গলবার এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য ৫ আগস্ট আনন্দের দিন, বিজয়ের দিন, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিন। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, এই দিনে দেশের বীর ছাত্র-জনতা এক ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে।’
তারেক রহমান বলেন, দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদের পতন এবং দেশে জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার তথা জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিএনপিসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দল এবং ভিন্নমতের মানুষকে সীমাহীন নির্যাতন-নিপীড়ন সইতে হয়েছিল। অসংখ্য মানুষ গুম, খুন, অপহরণ, হামলা, মামলা, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে আপসহীন দেশনেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকেও মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর জালিমের কারাগারে কাটাতে হয়েছে।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রকামী মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পলাতক স্বৈরাচারের নির্দেশে দেশে গড়ে তোলা হয়েছিল শত শত গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’। ‘আয়নাঘরের’ অন্ধকার প্রকোষ্ঠে এক সীমাহীন অনিশ্চয়তায় মাসের পর মাস, বছরের পর বছর অগণিত মানুষকে আটকে রাখা হয়েছিল। অনেককে চিরতরে গুম করে ফেলা হয়েছে। বিএনপির সাবেক এমপি ইলিয়াস আলী ও কমিশনার চৌধুরী আলমসহ এমন অনেক নেতা–কর্মীর আজও সন্ধান মেলেনি।
তারেক রহমান বলেন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশনসহ দেশের সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে ফেলা হয়েছিল। সংবিধান উপেক্ষা করে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল; নির্বাচনকে পরিণত করা হয়েছিল প্রহসনে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়ে দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছিল। ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট আর টাকা পাচারকেই স্বাভাবিক কাণ্ডে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল। দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্যক্তিতন্ত্র। তবে শেষ রক্ষা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, বীর ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক, রিকশাচালক, মুটে-মজুর, পোশাকশ্রমিক, হোটেল-রেস্তোরাঁকর্মী, পরিবহন শ্রমিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, গৃহবধূ, নারী ও শিশুসহ সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। গণ-অভ্যুত্থান দমনে মরিয়া ফ্যাসিস্ট সরকার রাজপথে গণতন্ত্রকামী জনগণের বুকে গুলি করে পাখির মতো মানুষ হত্যা করেছে। এমনকি জনগণের ওপর হেলিকপ্টার থেকেও গুলি চালানো হয়েছিল। স্বৈরাচারের বেপরোয়া গুলি থেকে মায়ের কোলে থাকা শিশু পর্যন্ত রেহাই পায়নি।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচারের বন্দুকের সামনে রংপুরের সাহসী প্রাণ শহীদ আবু সাঈদের চিতানো বুক, চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিম আকরাম কিংবা ঢাকার শহীদ মুগ্ধসহ আমাদের অসংখ্য সাহসী সন্তান হয়ে উঠেছিলেন গণতন্ত্রকামী মানুষের সাহসী প্রেরণা। শুধুমাত্র জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানেই হাজারো মানুষ শহীদ হয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ। শত শত মানুষ হাত-পা ও শরীরের অঙ্গ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন; অনেকেই আজীবনের জন্য দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।
তারেক রহমান আরও বলেন, হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। গণতন্ত্রকামী জনগণের সম্মিলিত আন্দোলনে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট গণভবন ছেড়ে পালিয়েছে। জাতীয় সংসদ ছেড়ে কথিত সংসদ সদস্যরা পালিয়েছে। আদালত ছেড়ে প্রধান বিচারপতি পালিয়েছে। বায়তুল মোকাররম ছেড়ে প্রধান খতিব পালিয়েছে। মন্ত্রিসভা ছেড়ে মন্ত্রীরা পালিয়েছে। ফ্যাসিবাদের দোসররা আত্মগোপনে চলে গেছে। ৫ আগস্ট বাংলাদেশে যা ঘটেছে, তা শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও এক নজিরবিহীন ঘটনা।
তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ থেকে আজ পর্যন্ত দেশের স্বাধীনতা অর্জন ও রক্ষা, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিটি বাঁকে লাখো মানুষ আত্মত্যাগ করেছেন। আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে সব শহীদকে স্মরণ করছি। দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা, অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য শহীদরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে আমাদের ঋণী করে গেছেন। প্রতিটি শহীদ পরিবারের কাছে বাংলাদেশ ঋণী। এখন শহীদদের প্রতি আমাদের ঋণ পরিশোধের পালা।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে আর কখনোই স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদ কায়েম হবে না, কখনোই দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে দেওয়া হবে না। এই সব মৌলিক প্রশ্নে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় ঐক্য অটুট আছে এবং থাকবে। ১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, আর ২০২৪ সাল ছিল দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশ কখনো ভোলেনি, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদেরও বাংলাদেশ কখনো ভুলবে না।
আরআই/টিএ