ইরানকে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিতে সৌদি আরব-তুরস্ক-পাকিস্তানের আমন্ত্রণ
ছবি: সংগৃহীত
০৯:৩৬ পিএম | ২৫ আগস্ট, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নতুন এবং অভাবনীয় মেরুকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি গঠিত মক্কা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য ইরানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের সমন্বয়ে এই শক্তিশালী সামরিক জোট গঠিত হয়। লেবাননভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল মেয়াদিন সম্প্রতি তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে।
তবে জোটভুক্ত তিন দেশের সরকার বা ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এই আমন্ত্রণের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি। তারপরও বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের নিজস্ব সংবাদ সংস্থা খানে মিল্লাতের প্রধান মেহেদী রহিমি সংবাদমাধ্যমটিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য ইরান এরই মধ্যে একটি নিমন্ত্রণপত্র হাতে পেয়েছে।
বর্তমানে ইরানের শীর্ষ নেতারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রস্তাবটি নিয়ে পর্যালোচনা করছেন। মেহেদী রহিমি মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন নিজেদের মধ্যে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে প্রবলভাবে ঝুঁকছে।
ইরানের জন্য এই আমন্ত্রণকে একটি বিশাল কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ তেহরান দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চলে বাইরের হস্তক্ষেপ ছাড়া নিজস্ব একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয়ের দাবি জানিয়ে আসছিল।
এর আগে গত ৭ আগস্ট পবিত্র মক্কা নগরীতে এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে তিন দেশ। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সেখানে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। তার সঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই চুক্তিতে সই করেন। এই জোটের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ও গভীর সামরিক সহযোগিতা।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী জোটের যেকোনো একটি দেশের ওপর আক্রমণ হলে তা তিন দেশের ওপরই সম্মিলিত হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এই নীতিকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর বিখ্যাত অনুচ্ছেদ ৫ এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তবে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে এই জোট নির্দিষ্ট কোনো দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনার জন্য তৈরি হয়নি। এটি মূলত সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব সুরক্ষার জন্য একটি মজবুত প্রতিরক্ষামূলক ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই জোটের দেশগুলো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নিজেদের মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। তারা ইতিমধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সামরিক বাহিনীর প্রধানদের মধ্যে নিয়মিত বৈঠকের রূপরেখা চূড়ান্ত করেছে।
এর পাশাপাশি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে যৌথ সামরিক মহড়া আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন ও শিল্পের ক্ষেত্রেও তারা একে অপরকে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করবে বলে চুক্তিতে বলা হয়েছে।
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে ভবিষ্যতে এই জোটের পরিধি আরও অনেক বাড়তে পারে। মিশরের মতো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আরব দেশ আগামীতে এই জোটে যুক্ত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে ইরান শুরু থেকেই এই নতুন জোট গঠনের বিষয়ে বেশ ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়ে আসছে। গত ১০ আগস্ট ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেন।
তিনি জানান, এই জোট গঠন নিয়ে তেহরানের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। বরং এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করার ক্ষেত্রে যে কতটা জরুরি তারই একটি বড় প্রমাণ।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ইরানের এই অন্তর্ভুক্তির দাবিটি যদি শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়িত হয় তবে এই অঞ্চলের পুরো চিত্র বদলে যাবে। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত তিন দেশের তৈরি এই জোটের চরিত্র তখন আমূল পরিবর্তিত হবে।
দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে যে চরম বৈরী সম্পর্ক ছিল তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেকটাই কমে এসেছে। এখন তারা যদি একই সামরিক জোটে অবস্থান করে তবে তা গোটা বিশ্বের জন্যই একটি বড় চমক হবে।
বিশেষ করে তুরস্কের মতো শক্তিশালী দেশ এবং পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সঙ্গে ইরানের সামরিক সখ্য নতুন এক যুগের সূচনা করবে। এটি নিছক একটি চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে এক বিশাল এবং বিস্তৃত আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে।
আরআই/টিএ