বিদেশে চিকিৎসায় দেশ হারাচ্ছে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা
ছবি: সংগৃহীত
১১:২৬ এএম | ২৭ আগস্ট, ২০২৬
৬০ হাজার কোটি টাকা প্রতিবছর চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। দেশের মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে বিদেশে দিয়ে আসছেন এই টাকা। ৬০ হাজার কোটি টাকায় দেশে দুইটা পদ্মা সেতু করা যায়। এই পরিমাণ টাকাই প্রতি বছর যাচ্ছে চিকিৎসা খাতে। গবেষণা তথ্যে প্রকাশ-
দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা ও রোগ নির্ণয়ে সঠিক মান না থাকায় প্রতিবছর বিদেশে চলে যাচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ। এতেই দেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ৪৮ হাজার থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা (৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) চলে যাচ্ছে বিদেশে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই প্রবণতা বছরে প্রায় ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। আগামী ১০ বছরে (২০২৬–২০৩৫) দেশ থেকে চিকিৎসা বাবদ প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা (৭২ বিলিয়ন ডলার) বিদেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকা (৮৫ বিলিয়ন ডলার) এবং রোগীর সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (বিআইএম) ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের (বিএবি) এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য ও পূর্বাভাস উঠে এসেছে।
লাখ লাখ রোগী ছুটছেন বিদেশে
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) বরাতে উল্লেখ করা হয়, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ রোগী চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন।
বিদেশে রোগী যাওয়ার এই চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে বিদেশে চিকিৎসার পেছনে দেশ থেকে চলে যায় প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৩ সাল নাগাদ এই অঙ্ক দাঁড়ায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৮ হাজার থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা)।
রোগীপ্রতি গড় চিকিৎসার খরচও ক্রমাগত বাড়ছে
যেখানে ২০০৫ সালে রোগীপ্রতি গড় খরচ ছিল ৩ হাজার ৩০০ ডলার, ২০২৩ সালে তা উন্নীত হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ডলারে।
গবেষণার প্রক্ষেপণ অনুসারে, বিদেশে যাওয়ার এ প্রবণতা স্বাভাবিকভাবে (৮ শতাংশ হারে) বাড়তে থাকলে ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ৯২ লাখ রোগী বিদেশে যাবেন। এতে আগামী ১০ বছরে সম্মিলিতভাবে দেশ থেকে বাইরে চলে যাবে প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলার বা ৮ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। আর উচ্চ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই অর্থের পরিমাণ ৮৫ বিলিয়ন ডলার এবং রোগীর সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ভারতের ভিসা কড়াকড়ির প্রেক্ষাপটে রোগীরা এখন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও চীনের দিকে ঝুঁকছেন, যা এই ব্যয়কে আরও দীর্ঘমেয়াদি রূপ দিচ্ছে।
গবেষণা অনুযায়ী, দেশের চিকিৎসার ওপর মানুষের আস্থা হারানোর অন্যতম প্রধান কারণ রোগ নির্ণয়ের (ডায়াগনস্টিক) আন্তর্জাতিক মান ও স্বীকৃতির ঘাটতি। দেশে ১০ হাজারের বেশি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাবরেটরি থাকলেও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সনদপ্রাপ্ত (ISO 15189 স্বীকৃত) ল্যাবের সংখ্যা মাত্র ৯টি। অথচ একই অঞ্চলে ভারতে এ ধরনের ল্যাব প্রায় ২ হাজার ৩০০টি এবং চীনে ১ হাজার ১০০টির বেশি।
চিকিৎসার প্রায় ৭০ শতাংশ সিদ্ধান্তই ল্যাব পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে। দেশে আন্তর্জাতিক মানের রোগ নির্ণয়ের সুযোগ কম থাকায় রোগীরা বিদেশে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ডায়াগনস্টিক ল্যাবগুলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিয়ে এসে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে আগামী ১০ বছরে প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকা (৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার) দেশেই ধরে রাখা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ
অর্থের অপচয় ঠেকাতে এবং বিদেশে রোগী যাওয়া কমাতে একগুচ্ছ সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে গবেষণায়:
আগামী এক বছরের মধ্যে একটি জাতীয় অ্যাক্রেডিটেশন নীতিমালা ও রোডম্যাপ তৈরি করা।
গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল স্বাস্থ্য পরীক্ষার ক্ষেত্রে ল্যাবগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক মান অর্জন ধাপে ধাপে বাধ্যতামূলক করা। ল্যাবের মান বাড়াতে সরকারি প্রণোদনা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দেওয়া। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) ও বিএবি-এর যৌথ উদ্যোগে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা।
টিএ/