জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উঁচু পর্বতের পাথর ও বরফের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ছে
ছবি: সংগৃহীত
১০:৪৯ এএম | ২৮ আগস্ট, ২০২৬
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উঁচু পর্বতের পাথর ও বরফের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় হিমালয় অঞ্চলে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়েছে। নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৩৫৯ জন হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখনো প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ৮০০ জনই বিদেশি পর্যটক।
হিমবাহ ধসের ফলে মাটি ও পাথরের একটি বিশাল অংশ হিমালয়ের একটি নদীতে আছড়ে পড়ার পর এই প্রলয়ংকরী বন্যা পাহাড়ি জনপদ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা এই বিপর্যয়ের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি বড় অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
বিজ্ঞানীদের মতামত ও দুর্যোগের কারণ:
ভিত নড়বড়ে হওয়া: আর্থ সায়েন্সেস নিউজিল্যান্ডের ‘মাউন্টেনস টু সি’ কর্মসূচির প্রধান বিজ্ঞানী সাইমন কক্স জানিয়েছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে তাপমাত্রা বাড়ায় খাড়া ঢালের বরফের বাঁধন দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং গলিত বরফের পানির প্রবাহ বাড়ছে। ফলে উঁচু পর্বতের পাথর ও বরফের ভিত নড়বড়ে হয়ে এ ধরনের দুর্যোগ বারবার ঘটছে।
প্রাথমিক ধস ও ভূমিকম্পের প্রভাব: বিজ্ঞানীরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, নেপালের ‘লাংটাং লিরুং’ চূড়ার উত্তর ঢালে একটি বিশাল হিমশিলা ধসে পড়ার পর তা তিব্বতের ‘লেন্দে খোলা’ নদীতে আছড়ে পড়ে। ইসিমোডের ক্রায়োস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ ফারুক আজমের মতে, অতিরিক্ত তুষার গলে যাওয়ার পাশাপাশি ভূকম্পনের কারণে এই প্রাথমিক ধসের সৃষ্টি হয়েছিল।
বহুবিধ প্রভাব: হংকংয়ের সিটি ইউনিভার্সিটির ডিন বেঞ্জামিন হর্টন উল্লেখ করেছেন, জলবায়ুর কারণে বরফ জমা মাটি গলে যাওয়া এবং পাহাড়ি ঢালের দুর্বলতার সঙ্গে যখন ভূমিকম্প যুক্ত হয়, তখন ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি জটিল ও ধ্বংসাত্মক রূপ নেয়।
ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও অবকাঠামোগত বিপর্যয়:
এই ধারাবাহিক বিপর্যয়ের কারণে সীমান্তজুড়ে অন্তত ছয়টি বড় জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ধ্বংস হয়েছে জিরং স্থলবন্দরের বাণিজ্যকেন্দ্রের অবকাঠামোগুলো। এছাড়া ভারত সীমান্তের কাছাকাছি ভাটির ১০০ কিলোমিটারের বেশি এলাকার নদীর গতিপথও এর মাধ্যমে প্রভাবিত হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি ও উদ্বেগ:
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিব্বত-নেপাল সীমান্তের জিরংয়ের বন্যা (২০২৫), থামে গ্রামে হিমবাহের হ্রদ বিস্ফোরণ (২০২৪) কিংবা সিকিমের দুর্যোগের (২০২৩) মতো ঘটনাগুলো হিন্দুকুশ পর্বতমালায় ঝুঁকি বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। জাতিসংঘের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে মাত্র ৩০ বছরের ব্যবধানে নেপালের তুষারাবৃত পাহাড়গুলো তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইসিমোডের মতে, পানি, ভূমি ও আবহাওয়ার এই দ্রুত পরিবর্তন সামগ্রিকভাবে এই অঞ্চলের মানুষকে চরম ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
এফআর/টিএ