যেভাবে গুম হয়েছিলেন সালাহউদ্দিন আহমদ
ছবি: সংগৃহীত
১২:১৯ পিএম | ৩০ আগস্ট, ২০২৬
২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে তৎকালীন বিএনপির মুখপাত্র সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছিলেন তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
একই বছরের ১১ মে ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে স্থানীয় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় সালাহউদ্দিন আহমদের করা গুমের অভিযোগের তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে প্রসিকিউশন। তাকে কী প্রক্রিয়ায় ভারতে নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে তথ্যের পাশাপাশি ভারতে তার বিরুদ্ধে হওয়া ফরেনার্স অ্যাক্টের মামলার অনুলিপিও সংগ্রহ করেছে প্রসিকিউশন।
আসামিদের বিরুদ্ধে যে মূল তথ্য-প্রমাণ প্রয়োজন, সেটিও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, অনেক আসামি ইতোমধ্যে জেলে আছেন।
আরও কিছু আসামির বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের ভিত্তিতে তাদের গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া নেওয়া হবে।
২০২৫ সালের ৫ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে গুমের অভিযোগ দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়।
শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য যাদের নাম অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এবং পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম। এ ছাড়া আরও অজ্ঞাতনামা অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে জিয়াউল আহসানকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এ মামলার বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, যেসব ভিকটিম দীর্ঘদিন গুম ছিলেন এবং পরবর্তীতে উদ্ধার হয়েছেন, তাদের বিষয়েও তদন্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে সালাহউদ্দিন আহমদের বিষয়টি অন্যতম।
তিনি বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদকে কী প্রক্রিয়ায় ভারতে নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে তদন্ত করা হয়েছে। ভারতে তার বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্টের ১৪ ধারায় যে মামলা হয়েছিল, তার অনুলিপি ইতোমধ্যে ভারত থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। ওই মামলায় আদালতে উপস্থাপন করা তথ্য-প্রমাণও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ভারতের আদালতে সালাহউদ্দিন আহমদের নিজের বক্তব্য, তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষে দেওয়া বক্তব্য, যে চিকিৎসকের কাছে তাকে নেওয়া হয়েছিল তার বক্তব্য এবং যারা তাকে উদ্ধার করে পুলিশের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাদের বক্তব্য রয়েছে।
এসব বক্তব্য পর্যালোচনা করছে প্রসিকিউশন। এতে দেখা যায়, সালাহউদ্দিন আহমদকে বাংলাদেশ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপহরণ করে নিয়ে যায়।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, প্রথমে বাংলাদেশে প্রায় ৬১ দিন তাকে টিএফআই সেলে, যা ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিত, আটকে রাখা হয়। পরে তাকে মেঘালয়ের শিলংয়ে নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখানে তিনি ট্রমাটাইজড অবস্থায় ঘোরাফেরা করছিলেন। পরে কয়েকজন স্থানীয় যুবক তাকে দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।
তিনি বলেন, ট্রমাটাইজড থাকার কারণে সালাহউদ্দিন আহমদকে প্রথমে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরবর্তীতে তার কাছে পাসপোর্ট বা কোনো বৈধ ভ্রমণ নথি না থাকায় তার বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্টের ১৪ ধারায় মামলা করা হয়।
ওই মামলার বিচার শেষে উভয় পক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ করা হয়। ভারতীয় পুলিশের পক্ষের সাক্ষীরাও আদালতে স্বীকার করেন যে, তাকে বাংলাদেশ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপহরণ করে ভারতে নিয়ে গিয়ে সেখানে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ভারতীয় পুলিশের সাক্ষী এবং সালাহউদ্দিন আহমদের পক্ষে দেওয়া সাক্ষ্য, উভয় পক্ষের সাক্ষ্যেই প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি স্বেচ্ছায় ভারতে যাননি। বরং বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে অপহরণ করে ভারতে নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। এ বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় ভারতীয় আদালত তাকে বেকসুর খালাস দেন।
এই খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে ভারত সরকার আপিল করে। আপিলেও আদালত একই সিদ্ধান্ত দেন বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, আপিল আদালতেও প্রমাণিত হয়েছে যে, সালাহউদ্দিন আহমদকে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপহরণ করে ভারতে নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। তিনি নির্দোষ ছিলেন এবং অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি সেখানেও খালাস পান।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এই তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিবেদন দাখিলের কাছাকাছি চলে এসেছি। আসামিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় মূল তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। অনেক আসামি ইতোমধ্যে জেলে আছেন। আরও কিছু আসামির বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের ভিত্তিতে তাদের গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া নেওয়া হবে। সময়মতো বিষয়টি জানানো হবে।
যেভাবে শিলংয়ে পৌঁছান সালাহউদ্দিন
২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নেওয়ার পর ১১ মে ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে স্থানীয় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।
ভারতীয় পুলিশের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, সালাহউদ্দিন আহমদ শিলংয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরি করার সময় স্থানীয় লোকজনের ফোন পেয়ে পুলিশ তাকে আটক করে।
সালাহউদ্দিনকে আটকের পর বৈধ নথিপত্র ছাড়া ভারতে প্রবেশের অভিযোগে দেশটির ফরেনার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী মামলা করে মেঘালয় পুলিশ।
২০১৫ সালের ২২ জুলাই ভারতের নিম্ন আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশের অভিযোগে অভিযোগ গঠন করা হয়। এ মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ে ২০১৮ সালে সালাহউদ্দিন খালাস পান। ভারত সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে তাকে সেখানেই থাকতে হয়।
২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আপিলেও খালাস পান সালাহউদ্দিন আহমদ। আদালত তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন। একই বছরের ৮ মে তিনি ভ্রমণ অনুমোদনের জন্য আসাম রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করেন। ভ্রমণ অনুমোদন দেওয়া হলে তিনি নিজ দেশে ফিরতে চান এবং দেশবাসী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হতে চান বলে জানিয়েছিলেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ৬ আগস্ট সালাহউদ্দিন আহমদ দেশে ফেরার জন্য ভ্রমণ অনুমোদন বা ট্রাভেল পাস পান। ১১ আগস্ট তিনি দেশে ফেরেন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এসএন