© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণে তরুণদের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হলো ‘ম্যানগ্রোভ কনভেনশন ২০২৬’

শেয়ার করুন:
উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণে তরুণদের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হলো ‘ম্যানগ্রোভ কনভেনশন ২০২৬’

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১০:৫৬ পিএম | ৩০ আগস্ট, ২০২৬
উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারের লক্ষ্যে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী ‘ম্যানগ্রোভ কনভেনশন ২০২৬: ইয়ুথ ভয়েসেস ফর কোস্টাল রেজিলিয়েন্স’।

পরিবেশবাদী তরুণ সংগঠন ইয়ুথফরওশান (Youth4Ocean)-এর উদ্যোগে এবং ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ, লিডার্স (LEDARS) ও বাংলাদেশ বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন ফেডারেশন (BBCF)-এর সহযোগিতায় কনভেনশনটি অনুষ্ঠিত হয়।

কুয়াকাটার প্রেসিডেন্ট পার্ক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে তরুণ, পরিবেশকর্মী, গবেষক, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন।

ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ’র সমন্বয়ক শরীফ জামিলের সভাপতিত্বে দিনব্যাপী এই কনভেনশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব এ বি এম মোশাররফ হোসেন, এমপি। ম্যানগ্রোভ কনভেনশন উদ্বোধন করেন ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী, জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পটুয়াখালী। সম্মানিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের বরিশাল অঞ্চলের বন সংরক্ষক ড. মোল্ল্যা রেজাউল করিম।

বিশেষ অতিথি ও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. মোহাম্মদ মুসলেম উদ্দিন, অধ্যাপক (সাবেক চেয়ারম্যান), সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ডিসিপ্লিন, ড. মো. জাহিদুর রহমান মিয়া, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগ, মোহন কুমার মন্ডল, লিডার্স এর নির্বাহী পরিচালক, এবং ড. নাসির উদ্দিন, বাংলাদেশ বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন ফেডারেশনের সভাপতি ও প্রত্যাশীর উপ-সহকারী পরিচালক।

প্রধান অতিথি, পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব এ বি এম মোশাররফ হোসেন, এমপি তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, “ম্যানগ্রোভ শুধু উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর নয়; এটি জীববৈচিত্র্য, মানুষের জীবন-জীবিকা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং নতুন কর্মসংস্থানের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়নে আমরা উপকূলীয় অঞ্চলে চলতি অর্থবছরে ৮ হাজার ২০০ হেক্টর এলাকায় ৩ কোটি ৬০ লাখ গাছ রোপণের পরিকল্পনা নিয়েছি।”

ম্যনগ্রোভ কনভেনশন এর উদ্বোধনী ঘোষনায় ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী, জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পটুয়াখালী বলেন বাংলাদেশ এখন জনসংখ্যাগত সুবিধার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রয়েছে এই বিপুল কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে কাজে লাগাতে হবে। প্রতিটি তরুণকে নিজের জায়গা থেকে একজন পরিবেশদূত হতে হবে।” তরুণদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, প্রকৃতি সংরক্ষণে প্রতিদিনের ছোট ছোট ব্যক্তিগত উদ্যোগ একত্রিত হলে বড় পরিবর্তন সম্ভব।

ড. মোল্ল্যা রেজাউল করিম, বন সংরক্ষক, উপকূলীয় সার্কেল, বরিশাল, বাংলাদেশ বন বিভাগ তাঁর বক্তব্যে বলেন, “উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন আমাদের প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর। কিন্তু উপকূলীয় ভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তন, গবাদিপশুর অবাধ চারণ, অবৈধভাবে বন উজাড়সহ নানা কারণে এই বন আজ হুমকির মুখে। সীমিত জনবল নিয়ে শুধু বন বিভাগের পক্ষে এ বন রক্ষা সম্ভব নয় স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”

ড. মোহাম্মদ মুসলেম উদ্দিন, অধ্যাপক (সাবেক চেয়ারম্যান), সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বলেন সমুদ্র পৃথিবীর অক্সিজেন, শক্তি ও জলবায়ু ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, আর ম্যানগ্রোভ উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে। তাই ম্যানগ্রোভ ও উপকূলীয় বনের গুরুত্ব শুধু জানলেই হবে না; এগুলোর প্রতি গভীর দায়িত্ববোধ ও অনুভব সৃষ্টি করেই সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে হবে।

 

ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী, অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর বক্তব্যে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন ক্ষয়ের পাঁচটি প্রধান কারণ তুলে ধরে বলেন বাণিজ্যিক মৎস্য ও লবণ চাষ, উপকূলীয় উন্নয়ন ও নগরায়ন, অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, পানি প্রবাহে বাধা ও দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন। তিনি আরও বলেন, প্রথম চারটি মানবসৃষ্ট চাপ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ম্যানগ্রোভ বন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম; এজন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধ।

অনুষ্ঠানের সভাপতি ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ’র সমন্বয়ক শরীফ জামিল তাঁর বক্তব্যে বলেন “বন বিভাগ আমাদেরই বিভাগ, আর এর কর্মকর্তারা আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের রক্ষক। আমরা যদি তাদের পাশে না দাঁড়াই, তাহলে দেশ ও বন রক্ষা করবে কে? যারা দেশের বন ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার দায়িত্বে রয়েছেন, তারা আমাদেরই মেধাবী সন্তান এবং আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের রক্ষক। আমরা যদি তাদের পাশে না দাঁড়াই, তাদের রক্ষা না করি, তাহলে তারা একা এই দেশ ও আমাদের বন-সম্পদ রক্ষা করবেন কীভাবে? তাই তরুণদের শুধু ম্যানগ্রোভ রক্ষার কথা বললেই হবে না, বন ও পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্ব পালনকারী মানুষগুলোর পাশেও দাঁড়াতে হবে।

উপরোক্ত বক্তাগণের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন, মীর মোহাম্মদ আলী, সহকারী অধ্যাপক, একুয়্যাকোলচারবিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবেশ বিষয়ক সাংবাদিক মাহমুদ রাকিব, আহসান রনি, সমন্বয়ক, ইয়ুথ ফর ওশান এবং নির্বাহী পরিচালক, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ; মেজবাহউদ্দিন মান্নু, সমন্বয়ক, ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), কলাপাড়া; মোঃ আশিকুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; নূর আলম এস কে, পশুর রিভার ওয়াটারকিপার এবং সমন্বয়ক, সুন্দরবন রক্ষায় আমরা (ধরা); শফিকুল ইসলাম খোকন, সমন্বয়ক, ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), পাথরঘাটা সহ আরও অনেকে।

কনভেনশনে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি, সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়। বক্তারা বলেন, সুন্দরবন ও উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ শুধু পরিবেশের রক্ষাকবচ নয়, লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহনশীলতারও মূল ভিত্তি। তাই ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কার্যকর নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সম্মেলনের মাধ্যমে উপস্থিত বক্তাদের পক্ষ থেকে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণে তরুণদের আরও সক্রিয় ও নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

কেএন/এসএন


মন্তব্য করুন