২১ দেশে প্রতি পাঁচ শিশুর একজন অনলাইনে যৌন নিপীড়নের শিকার: ইউনিসেফ
ছবি: সংগৃহীত
১১:৩৭ পিএম | ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
এক বছর সময়সীমার মধ্যে বিশ্বের ২১টি দেশে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ২ কোটি শিশুপ্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো না কোনো ধরনের যৌন নিপীড়ন, শোষণ বা হয়রানির শিকার হয়েছে। অর্থাৎ এসব দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের মধ্যে প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজন এ ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের নতুন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য।
‘থ্রু চিলড্রেনস আইজ: হাউ ডিজিটাল টেকনোলজিস এনেবল চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জরিপের তথ্যের পাশাপাশি শৈশবে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া শিশুদের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, গবেষণায় উঠে আসা চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যেসব দেশে জরিপ চালানো হয়েছে, সেখানে ২ কোটির বেশি শিশু অনলাইনে অনিচ্ছাকৃত যৌন কনটেন্ট, যৌন হয়রানি বা শোষণের শিকার হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনা ঘটেছে এমন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে, যেখানে শিশুরা পড়াশোনা করে, খেলাধুলা করে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে।
তিনি বলেন, অনেক শিশু ভয়ে বিষয়টি কাউকে জানায় 'না' এবং সাহায্যের জন্য কোথায় যেতে হবে, তা-ও জানে না। ফলে তারা নীরবে এই অভিজ্ঞতা বয়ে বেড়ায়।
ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, এসব দেশে ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি শিশু অনিচ্ছাকৃত যৌন কনটেন্টের মুখোমুখি হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৯০ লাখ শিশুকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন কথোপকথনে অংশ নিতে বা যৌন ছবি পাঠাতে বলা হয়েছে।
প্রায় ৪০ লাখ শিশুর যৌন ছবি তাদের সম্মতি ছাড়া অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রযুক্তির মাধ্যমে শিশুদের যৌন নিপীড়নের প্রায় ৬০ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্ম। আরও ১৪ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে অনলাইন গেমের মাধ্যমে।
তবে সব ক্ষেত্রেই অপরাধী যে অপরিচিত ব্যক্তি, তা নয়। বরং ৫৭ শতাংশ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুটির পরিচিত ছিল। এর মধ্যে সহপাঠী, প্রেমের সম্পর্কের ব্যক্তি, বন্ধু এবং পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন।
অন্যদিকে, প্রায় ৩৮ শতাংশ শিশু, প্রথমবার অপরাধীর সংস্পর্শে আসে অনলাইনে। ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও ব্যক্তিগত বার্তার মতো বিভিন্ন ডিজিটাল সুবিধা ব্যবহার করে এসব যোগাযোগ তৈরি করা হয়।
প্রযুক্তির মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের শিকার শিশুদের ওপর এর গভীর মানসিক প্রভাব পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী শিশুরা ভয়, লজ্জা, বিভ্রান্তি ও একাকিত্বের অনুভূতির কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে অন্যদের প্রতি তাদের নিরাপত্তাবোধ ও বিশ্বাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের নিপীড়নের শিকার শিশুরা আত্মহত্যার চিন্তা বা আচরণ এবং আত্মক্ষতির প্রবণতার কথা চার গুণ বেশি জানিয়েছে। তাদের মধ্যে উদ্বেগের মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
মেক্সিকো ও মেসিডোনিয়ায় যৌন নিপীড়নের শিকার শিশুদের আত্মহত্যার চিন্তা বা আচরণের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় আট গুণেরও বেশি ছিল।
আর পাকিস্তানে এ ধরনের শিশুদের আত্মক্ষতির ঝুঁকি ছিল সাত গুণেরও বেশি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এসব ঘটনার ৪০ শতাংশের বেশি কখনো কাউকে জানানো হয়নি।
আর পুলিশ, সমাজকর্মী বা হেল্পলাইনের মতো কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করা হয়েছে ১ শতাংশেরও কম ঘটনা।
ইউনিসেফ বলছে, শিশুদের নীরব থাকার সবচেয়ে বড় কারণ—কোথায় যেতে হবে বা কাকে বিষয়টি জানাতে হবে, তা শিশুরা জানে না।
শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা জোরদারে সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ।
প্রতিবেদনে শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা জোরদার, প্রাপ্তবয়স্কদের অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ সীমিত করা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কনটেন্ট ব্যবস্থা আরও নিরাপদ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে যৌন নিপীড়নের ঘটনা শনাক্ত ও রিপোর্ট করার ব্যবস্থা উন্নত করা, আইন আরও শক্তিশালী করা এবং আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
পরিবার, স্কুল ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য আরও সহায়তার ব্যবস্থার প্রয়োজন বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, অনলাইনে শিশুদের সুরক্ষায় সরকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে।
প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে ২১টি দেশের প্রায় ২১ হাজার ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুর ওপর পরিচালিত জাতীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিত্বশীল জরিপের ভিত্তিতে। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ১২ থেকে ১৭ বছর। এর পাশাপাশি শৈশবে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া ১০০ তরুণের সঙ্গে বিস্তারিত সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।
তবে ইউনিসেফ সতর্ক করে বলেছে, জরিপের ফলাফল সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের প্রতিনিধিত্ব করে, সব শিশুর নয়। বিশেষ করে যেসব দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ তুলনামূলক কম, সেখানে সামগ্রিক শিশু জনগোষ্ঠীর ওপর এই পরিসংখ্যান সরাসরি প্রযোজ্য নয়।
এমআই/টিএ