বিশ্বের সবচেয়ে দামি পনিরের নাম ‘গাধার বাচ্চা’, তৈরি হয় গাধার দুধে
ছবি: সংগৃহীত
১১:৫১ এএম | ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
চিজ বা পনির বলতেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে পিৎজা, পাস্তা কিংবা নানা মুখরোচক খাবারের ছবি। কিন্তু এক কেজি পনিরের দাম যদি হয় এক হাজার ইউরোরও বেশি, তাহলে তা নিঃসন্দেহে অবাক করার মতো। আরও অবাক করা বিষয় হলো, এই পনির তৈরি হয় গরু বা ভেড়ার দুধে নয়, বিরল প্রজাতির গাধার দুধে।
বিশ্বের সবচেয়ে দামি পনিরগুলোর একটি ‘পুলে’। সার্বিয়ার জাসাভিকা এলাকায় তৈরি এই বিশেষ পনিরের নামের অর্থ ‘গাধার বাচ্চা’। দুষ্প্রাপ্য গাধা, অল্প পরিমাণ দুধ, জটিল উৎপাদন পদ্ধতি এবং বিরলতার কারণেই এর দাম এত বেশি।
যেভাবে শুরু পুলের গল্প
পুলের গল্প শুরু হয় ১৯৯৭ সালে। সার্বিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য ও পরিবেশবিদ স্লোবোদান সিমিচ সার্বিয়ার জাসাভিকা বিশেষ প্রাকৃতিক সংরক্ষণ এলাকা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা বলকান জাতের গাধা সংরক্ষণ করা।
একসময় সেখানে গাধার সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২০০-তে পৌঁছায়। তখন বিপুল পরিমাণ গাধার দুধ নিয়ে কী করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন সিমিচ। পরে বেলগ্রেডের একজন পনির প্রস্তুতকারকের সঙ্গে মিলে এই দুধ দিয়ে পনির তৈরির উদ্যোগ নেন।
সেখান থেকেই তৈরি হয় বিশ্বের প্রথম গাধার দুধের পনির পুলে।
যে কারণে এত দাম
পুলের দাম এত বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো এর উৎপাদন প্রক্রিয়া। একটি গাধী দিনে দুই লিটারেরও কম দুধ দেয়। অন্যদিকে একটি কেজি পুলে পনির তৈরি করতে প্রয়োজন হয় প্রায় ২৫ লিটার দুধ।
গাধার দুধ সংগ্রহ করাও সহজ নয়। যন্ত্রের সাহায্যে গাধার দুধ দোয়ানো সম্ভব নয়। গাধার বাচ্চাকে সামনে রেখে মানুষের হাতেই দিনে তিনবার দুধ সংগ্রহ করতে হয়। আবার গাধীর দুধ পেতে তার বাচ্চা হওয়ার পর অন্তত তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়।
সব মিলিয়ে অল্প দুধ, বেশি শ্রম এবং দীর্ঘ সময়ের কারণেই এই পনিরের উৎপাদন অত্যন্ত সীমিত।
কীভাবে তৈরি হয় পুলে?
পুলে পুরোপুরি গাধার দুধ দিয়ে তৈরি হয় না। এতে প্রায় ৬০ শতাংশ গাধার দুধের সঙ্গে ৪০ শতাংশ ছাগলের দুধ মেশানো হয়।
বিশেষ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করে দুধ জমাট বাঁধানো হয়। এরপর প্রায় ৫০ গ্রামের ছোট ছোট পনির তৈরি করা হয়। এগুলোকে বিশেষ ছাঁচে ঢেলে সোনালি পিরামিডের মতো আকৃতি দেওয়া হয়।
স্বাদ ও গঠনের দিক থেকে এটি কিছুটা স্পেনের মানচেগো পনিরের মতো। পনিরটি তুলনামূলকভাবে ভঙ্গুর, হালকা হলদেটে এবং স্বাদে মৃদু মিষ্টি-টক।
গাধার দুধে গরুর দুধের তুলনায় ভিটামিন সি-এর পরিমাণও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুরুতে খেতে চাননি অনেকেই
পুলে তৈরির শুরুতে সিমিচের বন্ধুরাও এই পনির খেতে আগ্রহী ছিলেন না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
ধনী রুশ ব্যবসায়ী থেকে ইউক্রেনের ব্যাংকার—অনেকেই শুধু এই পনিরের স্বাদ নিতে সার্বিয়ার ওই খামারে ছুটে আসেন বলে জানা যায়।
সার্বিয়ায় স্থানীয়ভাবে পাতলা করে কাটা পুলে পনিরের সঙ্গে শূকর বা গাধার মাংসের সসেজ এবং স্থানীয় ফল থেকে তৈরি ব্র্যান্ডি পরিবেশনের প্রচলন রয়েছে।
ক্লিওপেট্রা ও হিপোক্রেটিসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে ইতিহাস
গাধার দুধ নিয়ে বহু পুরোনো নানা গল্পও প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, মিসরের রানি ক্লিওপেট্রা সৌন্দর্য ধরে রাখতে গাধার দুধে গোসল করতেন। প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিসও গাধার দুধকে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করতেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে এসব ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে পুলে পনিরের আধুনিক জনপ্রিয়তার সম্পর্ক আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
চাইলেই মিলবে না এই পনির
পুলের বিরলতার আরেকটি কারণ হলো এর আইনি সীমাবদ্ধতা। সার্বিয়ার সরকারি দুগ্ধজাত পণ্যের তালিকায় গরু, ছাগল ও ভেড়ার দুধের উল্লেখ থাকলেও গাধার দুধের বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে আইনি অনুমোদন বা স্বীকৃতি নেই।
ফলে এই পনির বিদেশে রপ্তানি করা বা বড় পরিসরে বাণিজ্যিক উৎপাদন করা সম্ভব নয়। তাই পুলের স্বাদ নিতে হলে সার্বিয়ার জাসাভিকা সংরক্ষণ এলাকার সেই খামারেই যেতে হয়।
অল্প দুধ, বিরল গাধার জাত, কঠিন উৎপাদন প্রক্রিয়া, সীমিত সরবরাহ এবং আইনি বাধা—সব মিলিয়ে পুলে শুধু একটি পনির নয়, খাবারের জগতের এক বিরল ও ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।
এফআর/টিএ