© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

বিএনপি-জামায়াতকে নির্যাতন করেও আছেন দাপটের সাথেসুনামগঞ্জ শহরে ওসি আমিনুল'র পাঁচতলা বাড়ীসহ বিপুল অবৈধ সম্পদ

শেয়ার করুন:
সুনামগঞ্জ শহরে ওসি আমিনুল'র পাঁচতলা বাড়ীসহ বিপুল অবৈধ সম্পদ
মোজো ডেস্ক
০৭:৩২ পিএম | ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
সুনামগঞ্জ শহরে নির্মাণ করেছেন পাঁচতলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল বাড়ি। কিনেছেন জায়গা-জমিও। গড়ে তুলেছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। বিপুল পরিমাণের অবৈধ সম্পদের মালিক সুনামগঞ্জের দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃবৃন্দকে পেটানোর অভিযোগ রয়েছে। দিয়েছেন গায়েবি মামলাও। তার যখন তদন্ত কিংবা বিচারের মুখোমুখি হবার কথা সেই ওসির দাপট চলছে ঠিক আগের মতো। 

এবিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন'র সুনামগঞ্জ জেলা সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক সাঈদ বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে বিরোধী দলমত দমনে অতি উৎসাহী পুলিশ অফিসারদের মধ্যে সে একজন। তার বিরুদ্ধে অসংখ্য দুর্নীতি ও বিরোধীদের দমনের বিশাল অভিযোগ রয়েছে। তাকে দিয়ে বর্তমান সরকার কতটুকু সুশাসন নিশ্চিত করতে পারবে তা নিয়ে পুরোপুরি সন্দিহান। সে সুযোগ পেলেই কিন্তু ফ্যাসিস্টের পারপার্স সারভ করবে এবং বর্তমান সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলবে। সরকারকে তার ব্যাপারে আরো সতর্ক হওয়া উচিত। থানার ভার্রপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মত গুরুত্বপূর্ণ পদে তাকে রাখা উচিত নয়। তার দুর্নীতিসহ সকল কর্মকান্ডের তদন্ত করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। 

সুনামগঞ্জ শহরে পাঁচতলা বাড়ি

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুলিশ পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম (বিপি নং-৭৫০২০০৮৬৮৩) সুনামগঞ্জ পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের উপত্যকা হাসননগরে (শান্তিবাগ) নিজের নামে পাঁচতলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল সুরম্য বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এ.আর.এস মহল নামের এই বাড়িটির সুনামগঞ্জ পৌরসভার হোল্ডিং নম্বর-১৮১। 

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী,ষোলঘর মৌজায় ওই বাসার মালিকের নাম আমিনুল ইসলাম এবং তার পিতার নাম সিদ্দিকুর রহমান। বিগত ২০২২-২০২৩ অর্থ বছর থেকে ২০২৩-২০২৪/ ২০২৪-২০২৫/ ২০২৫-২০২৬/ ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের পৌর কর তিনি পরিশোধ করেন। 

সর্বশেষ চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি চলিত অর্থ বছরের পৌর কর হিসেবে ৭ হাজার ৯১৪ টাকা পৌর কর দেন পরিশোধ করা হয়। যার রশিদ নং- জে.বি-২৮/৯/২৬। 

সুনামগঞ্জ পৌরসভার নথিপত্র অনুযায়ী, আমিনুল ইসলাম তার এই পাঁচতলা বাসার কর হিসেবে চলতি অর্থ বছরসহ টানা ৫ বছর প্রতি বছরে ৭ হাজার ৯১৪ টাকা করে পৌর কর পরিশোধ করেছেন। 

স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, ষোলঘর মৌজায় যে এলাকায় ওই বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে এর প্রতি শতক জমির বর্তমান বাজার মূল্য ১৩ লাখ টাকা থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। ওই বাড়ির অবস্থান পৌরসভার রাস্তার ঠিক কাছে তাই এর মূল্য স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বেশি। বাড়ির আনুমানিক জমির পরিমাণ আট শতক। জমিসহ পাঁচতলা বিশিষ্ট এই বাড়ির মূল্য প্রায় সাত কোটি টাকা বলে স্থানীয়রা জানান। তবে, স্থানীয়দের কেউ এবিষয়ে পত্রিকায় কথা বলতে রাজি হননি। 

এই বাড়ি ছাড়াও ওসি আমিনুল ইসলাম সুনামগঞ্জ ও সিলেটের বিভিন্ন জায়গায় নামে বেনামে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার অবৈধ সম্পদের বিষয়ে খোদ পুলিশের অভ্যন্তরে নানা কথা চাউর আছে। 

অভিযোগের শেষ নেই

জানা গেছে,আমিনুল ইসলামের অপকর্মের শেষ নেই। সুরমা নদী ও ধোপাজান নদীতে ড্রেজার দিয়ে বালু লুট ও চাঁদাবাজির শেল্টার দেয়া,গায়েবী মামলা,রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন,জেল গেটে গ্রেফতার,বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার বাণিজ্য করে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। তখনকার সময়ে বিএনপি জামায়াতের নিরীহ নেতাকর্মীদেরকে হুমকি দিয়ে তার সোর্সের মাধ্যমে নিয়মিত লাখ লাখ টাকা আদায় করতেন। 

সুনামগঞ্জ জেলা শহরে ২০১৩ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত তিনি ছিলেন বিএনপি- জামায়াত'র নেতাকর্মীদের জন্যে মূর্তিমান আতংক। দীর্ঘদিন জেলা শহরে যে'কজন পুলিশ কর্মকর্তা অবৈধভাবে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়েছেন এই আমিনুল তাদের অন্যতম।তার অপকর্মের চিত্র ছাত্রদল,ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীদের ওয়ালে ওয়ালে এখন ঘুরছে। কত নিরীহ মানুষকে তার অপকর্মের শিকার হয়ে নিঃশেষ হতে হয়েছে তার হিসেব নেই।   অভিযোগের পাহাড় থাকার পরেও শুধুমাত্র বিএনপির এক প্রবাসী নেতার আত্মীয় পরিচয়ে গেল অন্তবর্তী সরকারের সময়ে নিজের খোলস পাল্টাতে মরিয়া হয়ে উঠেন। "গুণধর" এই আমিনুল ইসলাম কোন যাদুর বলে থানায় ওসির পোস্টিং পেলেন এমন প্রশ্ন খোদ পুলিশ কর্মকর্তাদের মুখে মুখে। 

এদিকে,ওসি হিসেবে পোস্টিং পাবার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতৃবৃন্দ তার অতীত কর্মকান্ড তুলে ধরে লিখে যাচ্ছেন। 

বিএনপি-জামায়াত নেতাদের নির্যাতন 

হাসিনা সরকারের সময়ে বিএনপি জামায়াতের বহু নেতাকর্মী আমিনুল ইসলামের নির্যাতনের শিকার হন বলে অনেকে সিলেটের ডাককে জানিয়েছেন। তৎকালীন জেলা ছাত্রদল আহবায়ক,সদস্য সচিবকে পিটিয়ে জেল হাজতে পাঠানো হয়। জেলা ছাত্রশিবির সভাপতিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়। নির্যাতনের শিকার নেতৃবৃন্দ সেই সময়ের স্মৃতি তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন। তারা নির্যাতনকারী ওসি আমিনুল ইসলামের শাস্তির দাবি জানান।  

সর্বশেষ ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনের আগমুহূর্তে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে একটি কর্মসূচি শেষ করে ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ গোপনে গন্তব্যে ফেরার চেষ্টা করেন। বিভিন্ন বাসাবাড়ির পেছনের দিকে গিয়ে একসময় শান্তিবাগে ওসি আমিনুলের বাসার পাশের বাসায় যান। ঠিক এসময় ওসি আমিনুলের স্ত্রী তাদেরকে দেখে ফেললে তাৎক্ষণিক পুলিশ ডাকা হয়। সদর থানার তৎকালীন ওসি খালেদ ও ডিবির আমিনুল ইসলামসহ বিপুল পরিমাণ পুলিশ পুরো এলাকা ঘেরাও করে জেলা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. ফরহাদ,  জেলা ছাত্রদলের তৎকালীন আহবায়ক জাহাঙ্গীর আলম, সদস্য সচিব তারেক মিয়াসহ বেশ কয়েকজন দায়িত্বশীলকে পুলিশ আটক করে বেধড়ক নির্যাতন চালায়। শাহ ফরহাদ কোনোমতে পিটুনি খাওয়ার মধ্যেই পালিয়ে রক্ষা পেলেও জাহাঙ্গীর আলম ও তারেক মিয়ার ঠিকানা হয় শহরতলীর হালুয়ারগাও'র সুনামগঞ্জ জেলা কারাগার। 

সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. ফরহাদ ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক জাহাঙ্গীর আলম ওই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। এটি শুধু ওইদিনের ঘটনা। এরকম বহু ঘটনার জন্ম দিয়েছেন ওসি আমিনুল। 

একইভাবে জামায়াত-ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী তার হাতে নির্যাতনের শিকার হন। ২০১৮ সালে হাসননগরে তার নেতৃত্বে জেলা জামায়াত অফিসে (ইসামিক সেন্টার) হামলা করে দরজা জানালা ভাংচুর করা হয়। জেলা আমীর উপাধ্যক্ষ তোফায়েল আহমদ খান ও সেক্রেটারী মমতাজুল হাসান আবেদ'র বাসায় অভিযানের নামে ভাংচুর করা হয়। মোহাম্মদপুরে একটি বাসায় জেলা শিবির সভাপতি কুদরতে এলাহী মারুফকে লক্ষ্য করে গুলি করে পুলিশ। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান মারুফ। এসব ঘটনার নেতৃত্ব দেন ওসি আমিনুল। বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী মারুফ ওই ঘটনার রোমহষর্ক বর্ণনা দেন। 

এভাবে ওসি আমিনুলের নেতৃত্বে সুনামগঞ্জ শহরে প্রতিদিন বিভিন্ন বাসায় হানা দিত ডিবির টিম। শান্ত শহর সুনামগঞ্জকে অশান্ত করতে তিনি তৎপর থাকতেন।

ভুক্তভোগীরা যা বললেন:
 
সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. ফরহাদ বলেন, আওয়ামীলীগ শাসনামলে পুলিশ কর্মকর্তারা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দৌড়াবে এটা স্বাভাবিক বিষয়। এনিয়ে কারও বিরুদ্ধে রাগ বা ক্ষোভ থাকার কথা নয়। কিন্তু এই পুলিশ কর্মকর্তার বিষয় ভিন্ন। ওসি আমিনুল ইসলাম কতটা বেপরোয়া ছিল সুনামগঞ্জের বিএনপি,ছাত্রদলসহ আমাদের নেতাকর্মীরা এর সাক্ষী। তার নির্যাতন ছিল ভয়াবহ। তার কারণে ঘরবাড়িতে এক মুহূর্তের জন্যেও অবস্থান করা সম্ভব হয়নি।পৌরসভা নির্বাচনের প্রচারণাকালে সে ধানের শীষের লিফলেট পর্যন্ত বিতরণ করতে দেয়নি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের ঘটনার বর্ননা দিয়ে তিনি বলেন,আমরা ভেবেছিলাম যেহেতু তিনি বিএনপি নেতার আত্মীয় পরিচয় দেন তাহলে তিনি হয়তো বিপদের সময় কিছুটা হলেও নমনীয় হবেন কিন্তু ঘটনা হল এর উল্টো। তার স্ত্রী পুলিশ ডেকে এনে আমাদের ধরিয়ে দেন। আমিসহ ছাত্রদলের জেলার শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে পেটানো হয়।

শাহ ফরহাদ বলেন,স্বৈরাচারের শাসনামলে প্রশাসনে থাকা অতিউৎসাহী ‘ডেভিল’ পুলিশ কর্মকর্তাকে ওসির দায়িত্ব দেওয়ায় সত্যিই হতবাক হয়েছি। তিনি তার অতীত কর্মকান্ডের তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সরকারের নিকট দাবী জানিয়েছেন। 

সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেকআহবায়ক জাহাঙ্গীর আলম আক্ষেপ করে বলেন,এসব অতীত দিনের ঘটনা। আমরা এর সাথে জড়িতদের যথাযথ বিচার চাই। 

সুনামগঞ্জ পৌর জামায়াতের আমীর এ্যাডভোকেট আব্দুস সাত্তার মামুন বলেন,  এই পুলিশ কর্মকর্তার মাঝে নুন্যতম পেশাদারিত্ব ছিল না। এজন্যে সে আমাদের সাথে এরকম কর্মকাণ্ড করে গেছে। সাধারণ লোকজনকে ধরে নিয়ে তারপর টাকা নিয়ে ছেড়ে দেবার ঘটনা ছিল তার নিয়মিত কাজ। 
সে জামায়াতের অফিসে ভাংচুর করে। পুলিশ প্রশাসনের উচিত হবে এরকম দোষী কর্মকর্তাদের তদন্ত করে ব্যবস্হা গ্রহণ করা এবং যোগ্য, মানবিক কর্মকর্তাদের পোস্টিং দেয়া। এতে মানুষ উপকৃত হবেন, আইনশৃংখলা পরিস্থতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। 

সাবেক ছাত্রশিবির নেতা কুদরতে এলাহী মারুফ বলেন, একমাত্র আল্লাহর দয়ায় বেঁচে আছি না হয় সেদিন পুলিশের গুলিতে শহীদ হতাম। ওসি আমিনুল ওই ঘটনার নেতৃত্বে দেন। মারুফ বলেন,ওসি আমিনুলের কত ঘটনা বলব। তার প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করতে হবে। তাহলে মূল রহস্য উদঘাটন হবে তিনি কি পেশাদার ছিলেন নাকি "সন্ত্রাসী" ছিলেন। 

অভিযুক্ত ওসি আমিনুল'র বক্তব্য
এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বলেন,  আমরা সরকারের চাকরি করি। চাকরিকালে যার পক্ষে কাজ করি তিনি খুশী হন আর যার বিরুদ্ধে যায় তিনি ক্ষেপে যান।হয়তো এরকম কিছু হয়েছে। বাড়ির সত্যতা স্বীকার করে ওসি আমিনুল বলেন, বাড়িটি ব্যাংক থেকে ঋন নিয়ে করেছি। এখনও ব্যাংকের ঋন দিয়ে যাচ্ছি। কোন ব্যাংক থেকে কবে কত টাকা ঋন নিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি আমিনুল বলেন, এখন ব্যাংকের নাম মনে হচ্ছে না। কাগজপত্র দেখে বলতে হবে।

কেএন/টিএ

মন্তব্য করুন