ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. জসীম উদ্দীন আহমেদ। পুলিশের সাবেক আইজি ‘বেনজীরের ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত জসীম ও তার স্ত্রীর গত দেড় বছরে সম্পদ বেড়েছে সাড়ে আট কোটি টাকার। আছে ৪৪টি ফ্ল্যাট, দুটি বাড়ি, একটি সাততলা বিল্ডিং ও দুটি হোটেলের মালিকানা।
বর্তমানে তার হাতে নগদ অর্থ রয়েছে ১৫ কোটি টাকার বেশি। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে হামলার মামলাও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরে এক কোটি টাকার বেশি ব্যক্তিগত আয়কর দিয়েছেন জসীম উদ্দীন।
গত ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমার সময় নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামা এবং ২০২৪ সালের ২৯ মে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে দেওয়া হলফনামা দুটি পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বহুল আলোচিত-সমালোচিত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) বেনজীর আহমেদের কাছের লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন জসীম উদ্দীন আহমেদ। ২০২৪ সালে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জিতেছিলেন জসীম। আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারালেও দলটির বড় একটি অংশের সরাসরি সমর্থন ছিল এ বিত্তশালী ব্যক্তির প্রতি।
ওই নির্বাচনি প্রচারণার সভা-সমাবেশে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের কখনো ছেড়ে যাবেন না বলে ওয়াদা দিয়েছিলেন তিনি। মনোনয়ন জমার আগের দিন (২৮ ডিসেম্বর) জসীম উদ্দিনের বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার খবরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও তৈরি হয় ব্যাপক সমালোচনা।
মো. জসীম উদ্দীন আহমেদের ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল ও ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর তারিখের হলফনামা পর্যালোচনা করে জানা যায়, পেশাগতভাবে তিনি অভিজাত হোটেল ব্যবসায়ী। কক্সবাজারের রামাদা হোটেল (যেটি অফিসিয়াল হোটেল আইবিআইএস লিমিটেড নামে নিবন্ধিত) এবং চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালি এলাকায় জেসিকা ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামে হোটেল দুটি রয়েছে।
২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিলের হলফনামায় উল্লেখ ছিল, তার বার্ষিক আয় ১ কোটি ৭১ লাখ ৮৭ হাজার ১৭৫ টাকা। এর মধ্যে বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, দোকান ভাড়া ও ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় ছিল ১ কোটি ৮ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮৩ টাকা। পাশাপাশি তার বৈদেশিক আয় ছিল বার্ষিক ৬৩ লাখ ৯ হাজার ৫৯২ টাকা। তবে বৈদেশিক বিনিয়োগ কোন দেশে সেটি হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি। ওই সময়ে তার স্ত্রী তানজিনা সুলতানা জুহির বার্ষিক আয় ছিল ১০ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।
বর্তমান হলফনামা অনুযায়ী, জসীম উদ্দীন আহমেদের বার্ষিক আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৫৫ লাখ ৪৭ হাজার ১৬৬ টাকা। এক বছর ৮ মাসের ব্যবধানে বর্তমান আয়ের এক তৃতীয়াংশ বেড়েছে। তবে তার স্ত্রীর এখন আর কোনো আয় দেখানো হয়নি হলফনামায়।
বর্তমানে জসীমের আয়ের মধ্যে কৃষিখাত থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, দোকান ভাড়া ও ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় রয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ ৬৩ হাজার ৬৩৬ টাকা, ব্যবসা থেকে আয় দেখানো হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ ৬২ হাজার ১০০ টাকা। অন্যদিকে দেশের বাইরের উৎস থেকে আয় দেখানো হয়েছে ১৩ লাখ ১ হাজার ৪৩০ টাকা।
২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর তারিখের হলফনামায় বর্তমানে জসীমের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ৪০ কোটি ৪১ লাখ ৩৭ হাজার ৫১৩ টাকার। এ রমধ্যে বর্তমানে তার হাতে নগদ টাকা রয়েছে ১৫ কোটি ১ লাখ ৬২ হাজার ৭৫৯ টাকা। তার স্ত্রীর বর্তমানে সম্পদ রয়েছে ২ কোটি ৮৩ লাখ ৯৫ হাজার ৩০০ টাকার। হাতে নগদ অর্থ রয়েছে ১৪ লাখ ৫৭ হাজার ৩০০ টাকা।
অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে জসীম ও তার স্ত্রীর ১০ লাখ টাকা করে ২০ লাখ টাকা মূল্যের শেয়ার রয়েছে। এক বছর ৮ মাসের ব্যবধানে জসীম দম্পতির সম্পদ বেড়েছে ৮ কোটি ৪৫ লাখ ১৭ হাজার ৬৬ টাকা। এর মধ্যে জসীমের সম্পদ প্রায় ১৬ কোটি টাকার বাড়লেও জুহির সম্পদ প্রায় ৮ কোটি টাকার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল জসীমের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ছিল ২৪ কোটি ২৫ লাখ ৮৬ হাজার ২০০ টাকার। একইভাবে তার স্ত্রীর সম্পদ ছিল ১০ কোটি ৭৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৪৭ টাকার।
হলফনামায় জসীমের কাছে থাকা ৫০ ভরি সোনার দাম দেখানো হযেছে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তার স্ত্রীর হাতে সম্পদ দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার। স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে বর্তমানে জসীমের ১ দশমিক ৩৩ একর নাল জমি রয়েছে। ১৫ লাখ টাকার সেলামি দোকান এবং ১ কোটি ১১ লাখ ২৭ হাজার ৪০০ টাকা মূল্যের পুরাতন ৭ তলা বিল্ডিং রয়েছে। চন্দনাইশে তার দুটি বাড়ি, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ৪ কোটি ৬৮ লাখ ৯৩ হাজার ৯০০ টাকা, কক্সবাজারে ৩০টি ফ্ল্যাটের দাম দেখানো হয়েছে ৬ কোটি ৪০ লাখ ২০ হাজার টাকা।
চট্টগ্রাম নগরীর অভিজাত এলাকা খুলশীতে পাঁচটি ফ্ল্যাটের দাম দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা, পাঁচলাইশে তিনটি ফ্ল্যাটের দাম ধরা হয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ ৪৭ হাজার ২৫০ টাকা। কক্সবাজারে ছয়টি মিনি ফ্ল্যাট রয়েছে জসীমের। এসব ফ্ল্যাটের মূল্য ১ কোটি ৫৪ লাখ ২২ হাজার টাকা। তার স্ত্রী জুহির নামে নগরীর খুলশীতে একটি ১০ হাজার ৩০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট রয়েছে। যেটির মূল্য দেখানো হয়েছে ২ কোটি ১০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জসীম উদ্দীন আহমেদ ১ কোটি ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৫১ টাকা আয়কর দিয়েছেন।
২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিলে জসীম উদ্দীনের বিরুদ্ধে দুটি এনআই অ্যাক্টের এবং দুটি ফৌজদারি অপরাধের মামলা ছিল। এগুলো তদন্ত ও বিচারাধীন ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারে আটটির মতো মামলা হয়েছে জসীমের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে বর্তমানে ঢাকার মামলা দুটিতে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন বলে ২৯ ডিসেম্বরের হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। কয়েকটি মামলা এখনো তদন্তাধীন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবিতে দেখা যায়, জসীম উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার খবরে আগের ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে নেতাকর্মীরা সমালোচনা করছেন।
কেএন/টিএ