রাজধানী ঢাকায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) উদ্ভাবিত তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত পরিবেশবান্ধব ই-রিকশার পাইলটিং কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে।
আজ শনিবার সকালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন আফতাবনগর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এর আওতাধীন জিগাতলা এলাকায় পৃথক দুটি অনুষ্ঠানে এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
সকাল সাড়ে ৯টায় আফতাবনগরে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাড্ডা–রামপুরা সড়ক থেকে আফতাবনগরে প্রবেশকারী নির্ধারিত সড়কে ই-রিকশার পরীক্ষামূলক চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। অন্যদিকে, সকাল ১১টায় জিগাতলায় আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ধানমণ্ডি এলাকায় নতুন ই-রিকশা এবং মতিঝিল এলাকায় রূপান্তরিত ই-রিকশা (ব্যাটারি/প্যাডেল রিকশা হতে ই-রিকশায় রূপান্তরিত) চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান; সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান; প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন; প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব; ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. মাহমুদুল হাসান।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, ‘ঢাকার বাস্তবতায় ই-রিকশা চালু করতে হলে এর নকশা, কাঠামো, ব্রেকিং সিস্টেম ও ব্যাটারি নিরাপত্তা অবশ্যই বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত হতে হবে। এই পাইলট কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা বাস্তব সড়কে সেই মান যাচাই করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ করে শৃঙ্খলিত নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘দুর্ঘটনার মূল কারণ রাস্তার অভাব নয়, বরং বিশৃঙ্খলা ও নিয়ম না মানা। শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে এবং নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতেই বুয়েটের তৈরি এই ই-রিকশা পাইলটিং হিসেবে চালু করা হয়েছে। দ্রুত এটি পুরো ঢাকায় সম্প্রসারণ করা হবে।’
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন বলেন, ‘ই-রিকশা শুধু একটি যান নয়, এটি একটি পরিকল্পিত নগর পরিবহনের অংশ।
প্রযুক্তি, নকশা ও ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ের মাধ্যমেই ঢাকায় টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।’
প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ বলেন, ‘নগর পরিবহনে নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই ই-রিকশার কাঠামোগত স্থিতিশীলতা, নিয়ন্ত্রিত গতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।’
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ‘প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থা ছাড়া আধুনিক শহর গড়ে তোলা সম্ভব নয়। জিও-ফেন্সিং ও ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই ই-রিকশা একটি স্মার্ট নগর পরিবহন মডেল হিসেবে কাজ করবে।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘রিকশাচালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের আওতায় আনাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। প্রশিক্ষিত ও লাইসেন্সধারী চালকরাই নির্ধারিত এলাকায় ই-রিকশা চালাতে পারবেন। এতে যাত্রী নিরাপত্তা ও সড়ক শৃঙ্খলা নিশ্চিত হবে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. মাহমুদুল হাসান, এনডিসি বলেন, ‘পাইলট পর্যায়ে ই-রিকশা চালুর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে পুরো নগরীতে এটি সম্প্রসারণ করা হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান প্যাডেল রিকশাগুলোকে পর্যায়ক্রমে আধুনিক ও নিরাপদ ই-রিকশায় রূপান্তরের সুযোগ দেওয়া হবে।’
ঢাকা শহরে অনিয়ন্ত্রিত ও বিধিবহির্ভূতভাবে পরিচালিত ব্যাটারি সংযোজনকৃত প্যাডেল রিকশা ও ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বুয়েটের মাধ্যমে এই ই-রিকশার মানসম্মত নকশা প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীতে নকশাটি মন্ত্রণালয়ের কারিগরি কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হয় এবং পাইলটিং কার্যক্রম শুরু করা হয়।
নতুন নকশার ই-রিকশাটি সাধারণ ই-রিকশার তুলনায় উন্নত ব্রেকিং সিস্টেম, গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে। ৩৮ ভোল্টের লিথিয়াম ব্যাটারির মাধ্যমে একবার চার্জে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পথ চলাচল সম্ভব হবে।
পাইলট পর্যায়ে ই-রিকশার ব্রেকিং সক্ষমতা, ব্যাটারির কার্যকারিতা, গতি নিয়ন্ত্রণ, আরোহীর আরাম, কম্পন সহনশীলতা ও চালকের নিয়ন্ত্রণ দক্ষতা মূল্যায়ন করা হবে।
ই-রিকশা চলাচলে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ফলে ই-রিকশা নির্ধারিত এলাকার বাইরে বা প্রধান সড়কে চলাচল করতে পারবে না। একটি এলাকায় কতটি ই-রিকশা চলবে তা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ নির্ধারণ করবে।
ই-রিকশা চালানোর জন্য চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন প্রায় ২৪ হাজার রিকশাচালককে প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদান করেছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী।
এবি/টিকে